গণিত ক্লাসে একদিন






আব্দুল স্যার ক্ল্যাসে আসলেই সমসাময়িক বিষয় নিয়ে কথা তোলেন। উনি গণিতের শিক্ষক অথচ এমন ভাবে কথা বলেন যেন উনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান কিংবা সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক। গত কাল ক্লাসে এসেই প্রথমে লেকচার শুরু করলেন “বুঝলি আবারতো মধ্য প্রাচ্য তেলের দাম বাড়িয়ে দিল। নে সবাই একটা অংক কর। যদি তেলের মুল্য লিটারে ছয়টাকা বাড়ানো হয় তবে কি পরিমান খরচ কমালে একটা পরিবারের তেলের খরচ আগের মত থেকে যাবে।” 

স্যারের বলা শেষ হতে না হতেই জামিল উঠে দাড়ালো। স্যার অংক করতে পারবোনা তবে উত্তরটা বলতে পারবো। স্যার জানতেন জামিল দুষ্টুর দুষ্টু। তিনি বললেন তা শুনি আমাদের পন্ডিত মহাশয়ের উত্তর। জামিল বললো তেলের দাম বেড়েছে খরচ কমাতে হবে এমন ভাবে যেন আগের খরচরে সমান থাকে। আচ্ছা স্যার আগে যেন কত খরচ হতো? ওর কথা শুনে স্যারতো রেগে আগুন। আগে কত খরচ হতো তা কে জানে? ধর চল্লিশ টাকা। জামিল বললো তাহলে স্যার চল্লিশ থেকে ছয় বাদ দিলে চৌত্রিশ টাকার তেল কিনলেই খরচ আগের সমান থেকে যাবে। 

স্যারের অংক করানোর মুড চলে গেল। তিনি ক্লাসের সবাইকে বললেন আজ আর অংক করাবোনা। যে অংকটা বলেছি এর ওপর সবাই মতামত দাও। এবার উঠে দাড়ালো মহান। নামেই মহান কাজে লাপাত্তা। সে বললো স্যার যখন রান্না করবো তার কিছুক্ষন আগে কেউ একজন তেলের বোতলটা অন্য কোথাও লুকিয়ে রেখে আসলে তেল খরচ বেচে যাবে! স্যার একে একে নির্বাক হয়ে সবার কথা শুনতে লাগলেন। 

এবার অনীক উঠে দাড়ালো। মনে হচ্ছিল উঠতে তার বেশ কষ্ট হচ্ছে। সে বললো স্যার স্যার তেলের মুল্য বৃদ্ধি পেয়েছে তো কি হয়েছে ঘুষ বেশি করে খেলেইতো খরচ নিয়ে চিন্তা করতে হবেনা। আমাদের ক্লাসের বিজ্ঞানী জিহাদ বললো স্যার এতো কিছুর দরকার নেই রান্নার সময় চুলার পাশে তেলের বোতলের সিপি খুলে রাখলেইতো হলো। রান্না হবে আর তার সাথে তেলের একটা আন্তঃনাক্ষত্রিক যোগাযোগ হবে। এর ফলে যে বিক্রিয়া করবে তা নিউটনের তৃতীয় সুত্র মতে..........ওর বলা আর শেষ হলোনা স্যার ওকে থামিয়ে দিলেন। 

রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামায় আমাদের নিনাদ। এবার নিনাদ বলে উঠলো স্যার এটা ভারি অন্যায় সময় নেই অসময় নেই ইচ্ছে হল আর মধ্যপ্রাচ্য তেলের দাম বাড়িয়ে দেবে?এটা হতে পারেনা। তেলের দাম এভাবে বাড়লেতো আমাদের গণিতও পাল্টে যাবে। এতে করে ছাত্রছাত্রীদের চিন্তা শক্তি কমে যাবে। আমি এর তীব্র নিন্দা জানাই। রাজনীতিবিদের কথা শেষ হলে স্যার বললেন আচ্ছা করতে দিলাম অংক তা তোরা করলিনা আউল ফাউল উত্তর দিতে শুরু করলি আমি তাও মেনে নিলাম। কিন্তু তোর এই উত্তরের সাথে অংকটারতো কোন সম্পর্কই দেখতে পেলাম না। পাশ থেকে নিলয় বলে উঠলো স্যার সম্পর্ক আছে। ও দেখেন না কি মোটাসোটা। পেটেতো তেল জমেছে। ওর বাবা ওকে কষে একটা ধমক দিয়েছে। বলেছে দিন দিন বসে বসে খেয়ে তেল বৃদ্ধি করছো?তোমার তেল বাড়ানো কমাচ্ছি।  

 এবার উঠে দাড়ালো ইফতি। ও বললো স্যার তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়া এবং খরচ আগের মত রাখা ও দুটো এক করে সমাধান করতে অনেক কষ্ট হবে। এখন সবচেয়ে সহজ হবে যদি আমরা তেলের বদলে অন্য কিছু দিয়ে রান্না করি। আব্দুল স্যার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠে দাড়ালেন। ঘন্টা পড়ে গেছে। আজ তিনি কিছুই পড়াতে পারলেন না। তেলের দাম বেড়েছে কি করে তিনি পড়াবেন? ক্লাসের প্রায় সবাই কিছুনা কিছু বলেছে শুধু আমি কিছু বলিনি। স্যারের সেটা হঠাৎ খেয়াল হলো। স্যার বললেন কিরে তুই কিছু বললিনা যে? 

আমি বললাম স্যার আমি স্বর্গ। আমারতো তেলের দাম বৃদ্ধি নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই। আমার এখানেতো সব সময় সব কিছুই ফ্রি।আমার বোন পুন্যকে নিয়ে স্বর্গ সুখেই আছি। স্যার আরো একবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন স্বর্গতো স্বর্গ সুখেই আছে। তোরা দেখ তেলের বদলে অন্য কিছু আবিস্কার করতে পারিসকিনা যা দিয়ে রান্না করা যাবে।


জাজাফী
এস এম হল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


সন্ত্রাসবাদ




আধুনিক সভ্যাতার চরম উৎকর্ষতার এই যুগে বিশ্বের প্রায় তিনশোকোটি মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বাস করে। বর্তমান বিশ্ব ক্ষুধা,দারিদ্র,অপুষ্টি,নিরক্ষরতা,জনসংখ্যার বিস্ফোরণ ইত্যাদি সমস্যায় জর্জরিত। কিন্তু সব কিছুকে ছাপিয়ে আলোচনার শীর্ষে সন্ত্রাসবাদ। যা গোটা বিশ্বকে অস্থির করে তুলেছে। যেহেতু সন্ত্রাসবাদের সবর্জন স্বীকৃত কোন সংজ্ঞা নেই তাই কারা সন্ত্রাসী বা কারা সন্ত্রাসী নয় তা নিরুপন করা বেশ দুরুহ।বলা হয়ে থাকে “One Mans Terrorist is another mans Freedom Fighter” অর্থাৎ যে একজনের কাছে সন্ত্রাসী সে অন্যজনের কাছে মুক্তিযোদ্ধা। যেমন কশ্মীরীদের স্বাধীনতা আন্দোলন ভারতের কাছে বিচ্ছিন্নতাবাদ ও সন্ত্রাসবাদ। 

কিন্তু মুসলিম বিশ্ব সহ অনেকের কাছে তারা স্বাধীনতাকামী। তাদের যৌক্তিক দাবী খোদ জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত।অনুরুপ ভাবে ইসরাইলি বাহিনী যখন নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালিয়ে নিরাপরাধ লোকদের হত্যা করে, তাদের বাড়ি ঘর ধ্বংস করে তখন তা বিবেচিত হয় আত্মরক্ষার অধিকার হিসেবে । পক্ষান্তরে ফিলিস্তিনিরা পাল্টা আক্রমন করলে তা সন্ত্রাসবাদ বলে উচ্চবাচ্য করা হয়। 

মার্কিন তাবেদারী না করলে কতিপয় রাষ্ট্র হয় সন্ত্রাসীদের মদদদাতা।পক্ষান্তরে কন্ট্রাবিদ্রোহীদের সহ বিভিন্ন গুপ্তহত্যা ও গণহত্যার জন্য মার্কিনীরা যখন সামরিক সহায়তা দেয় তখন তাদেরকে সন্ত্রাসী বলে অভিহিত করা হয়না। এই কথা বলে সভ্যতার মূখোশ পরা যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলের মত একটি রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছে। মূলত যতদিন পযন্ত বিশ্বে মৌলিক মানবাধিকার ও সবার জন্য ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত না হবে ততদিন পযন্ত সন্ত্রাসী ও সন্ত্রাসবাদের সীমারেখা নিরুপন সম্ভব হবেনা।সন্ত্রাসবাদ বা Terrorism শব্দটির উদ্ভব হয় ফ্রান্সে ১৭৮৯-১৭৯৯ সালে ফরাসী বিপ্লব চলাকালীন সময়ে। এ সময়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চালু এবং জনপ্রিয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের লক্ষ্যে The Regime de La Terreur (Reign of Terror) নামে একটি বিশেষ পরিষদ গঠিত হয়। কিন্তু ফরাসী বিপ্লবের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি এবং সহিংস কর্মকান্ডের জন্য এই Terror রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের হাতিয়ারে পরিণত হয়। মনে করা হয়ে থাকে ঠিক তখন থেকে Terror  শব্দটি নেতিবাচক ভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে যথেষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে। 

ব্রায়ান জেংকিন্সের মতে “রাজনৈতিক পরিবর্তন সাধনের উদ্দেশ্যে শক্তির প্রয়োগ বা শক্তি প্রয়োগের হুমকিই সন্ত্রাসবাদ”। অনেকেই মনে করেন সন্ত্রাসবাদের কারণ নিয়ে আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক। কারণ সন্ত্রাস একটি অশুভ শক্তি এবং একে নিমূর্ল করাই মূল কথা। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা মনে করেন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালালে তা আরো সন্ত্রাসের জন্ম দেবে।
কেননা রাজনৈতিক,সামাজিক,সাংস্কৃতিক এমনকি ধমীর্য় কারণেও সন্ত্রাসবাদের জন্ম হতে পারে। অনেক ধমীর্য় গোষ্ঠী আছে যাদের ধারনা তাদের বিরোধীদের হত্যা করে নির্মূল করতে পারা পুন্যের কাজ। তেমনি অনেক উগ্রপন্থী খ্রিষ্ঠান ও এটাকে Crusade বা পবিত্র ধর্মযুদ্ধ মনে করেন। ফলে এরাই জড়িয়ে পড়ে সন্ত্রাসবাদে। কখনো কখনো ধর্মীয় মূলনীতির অপব্যাখ্যার ফলে সৃষ্টি হয় ধর্মীয় উগ্রবাদ যা ক্রমান্বয়ে সন্ত্রাসবাদের দিকে ধাবিত করে। বাস্তবতা আরো কঠিন। 

আমরা কেবল সন্ত্রাসবাদ সন্ত্রাসবাদ করে করে গলা ফাটাই। সন্ত্রাসবাদকে চিরতরে মিটিয়ে দেওয়ার জন্য লাখ লাখ নিরীহ মানুষকেও হত্যা করতে দ্বিধা করিনা। কিন্তু কখনো ভেবে দেখিনা কেন সন্ত্রাসবাদের জন্ম হয়। এটা ভুলে গেলে চলবেনা যে বৃহৎ রাষ্ট্রগুলো যখন তাদের বন্ধু রাষ্ট্রগুলোকে অন্যায় কর্মকান্ডে অর্থনৈতিক ও সামরিক মদদ যোগায় তখন প্রায় নিরস্ত্র নিযাতিত জনগণ অনন্যোপায় হয়ে সন্ত্রাসের পথ বেছে নেয়। এর জ্বলন্ত উদাহরণ হচ্ছে মাকির্নীদের ইসরাইলকে অনৈতিক কাজেও আর্থিক সমর্থন যোগানো। এর ফলে ইসরাইলরাই আক্রান্ত হচ্ছেনা খোদ আমেরিকাকেও চরম মূল্য দিতে হচ্ছে।বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে শুধু ধর্ম ও বর্ণের কারণে অনেক মানুষ প্রতিনিয়ত বৈষম্য ও নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছে। কোন অঞ্চলের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় যখন ধর্মীয় ও বর্ণবাদী কারণে তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় তখন মারাত্মক সামাজিক অসন্তোষ ও সন্ত্রাসবাদের জন্ম হয়। 

অপেক্ষাকৃত দুবর্ল রাষ্ট্রগুলোর ওপর ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রগুলোর আগ্রাসন ব্যপক সন্ত্রাসবাদের জন্ম দিয়ে গোটা বিশ্বকে বিপজ্জনক করে তুলেছে। ঠান্ডা লড়াইয়ের যুগে আমরা এর বিকাশ লক্ষ্য করেছি। এমনকি একবিংশ শতাব্দীতে সভ্যতার চরম উৎকর্ষতার এই যুগে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক আফগানস্তান,ইরাক সহ বিভিন্ন দেশে চালানো আগ্রাসন  গোটা বিশ্বকে সন্ত্রাসবাদের লীলাভূমিতে পরিণত করেছে।ফলে জন্ম নিয়েছে তালেবান,আলকায়দা কিংবা আইএসের মত সংগঠনগুলো। 

যুক্তরাজ্যের লিচেষ্টরশায়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এন্ড্রু সিল্কের মতে, পাল্টা সন্ত্রাস তথা সন্ত্রাসের মাধ্যমে সন্ত্রাস দমননীতির ফলে সন্ত্রাসবাদ বন্ধ হওয়াতো দূরের কথা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে। প্রতিটি সুস্থ বিবেক সম্পন্ন মানুষ সন্ত্রাসবাদকে ঘৃণা করে। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে তারা বাধ্য হয়ে সন্ত্রাসের আশ্রয় নেয়।তাই যেসব পরিস্থিতির কারণে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের জন্ম হয় সেসব চিহ্নিত করে তা প্রতিকারের ব্যবস্থা করতে পারলেই কেবল সন্ত্রাসবাদ বন্ধ করা সম্ভব।

 বিশ্ব এখন এমন এক সময় পার করছে যখন সন্ত্রাস মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী।অধিকার হারা মানুষ অধিকারের জন্য সন্ত্রাসের পথ বেছে নিচ্ছে। বিশ্ব ব্যাপী অশান্তি সৃষ্টি হচ্ছে। আর সেই মানুষের অধিকার কেড়ে নিয়ে তাদের সন্ত্রাসের পথে ঠেলে দিয়ে আবার সন্ত্রাস দমনের নামেও রাষ্ট্র নিজেই সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পরিচালনা করে যাচ্ছে।

 মানুষ কখনো সন্ত্রাসী হয়ে জন্মায়না, পরিস্থিতিই তাকে সন্ত্রাসী করে তোলে। তাই বিশ্বব্যপী সন্ত্রাসবাদ বিস্তারের কারণ গুলো চিহ্নিত করে প্রতিকার মূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।বিশ্বের প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হলে সন্ত্রাসবাদ আপনাআপনি কমে যাবে।মাহাত্মাগান্ধীর ভাষায় “চোখের বদলে চোখ নেওয়ার রীতি গোটা জাতিকে অন্ধ করে দিচ্ছে”।আমরা একটি শান্তিময় বিশ্বের স্বপ্ন দেখি। আগামীর বিশ্ব হোক সন্ত্রাস মুক্ত। নূর হোসেন বেঁচে থাকলে হয়তো নতুন করে বুকে পিঠে লিখতেন “সন্ত্রাসবাদ নিপাত যাক,গোটা বিশ্ব শান্তি পাক”।

……………..
জাজাফী
এস এম হল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ইমেইলঃ zazafee@yahoo.com   

মুক্ত আকাশ এখন যে তার

সকাল থেকে সন্ধ্যাবধি যার ছবিটা দেখি
ভুলেও কভু আমার কথা মনে করে সে কি।

এখন সেতো ব্যস্ত ভীষণ চারদিকে তার সুখ
কেন তবে কোন দুঃখে সে দেখবে আমার মূখ।

আকাশ নীলে তাকিয়ে থাকার সময় যে তার নেই
আকাশটাকেও ছাপিয়ে যাবে হয়তো অচিরেই।

সে তো আমার আকাশ ভরা তারার মাঝে চাঁদ
তার জোছনায় মুগ্ধ আমি পাগল ও উন্মাদ।
......................জাজাফী
২৬ আগষ্ট ২০১৫ রাত ৩.০৯

স্বপ্নঃ মধ্যম আয়ের দেশ




............জাজাফী

যুদ্ধ বিদ্ধস্ত বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে এক সময় যারা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এ দেশটিকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলে অভিহিত করতে দ্বিধা করেনি আজ তারাই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে এদেশের দিকে তাকিয়ে আছে। তারা বুঝে উঠতে পারছেনা একটা দেশ কিভাবে তলাবিহীন ঝুড়ির তকমাকে পায়ে ঠেলে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে। এক সময়ের তলাবিহীন ঝুড়ি বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার পথে। বাংলাদেশ যে এগিয়ে যাচ্ছে তা এখন বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। বিশেষ করে সামাজিক সূচকে বাঙলাদেশের অগ্রগতি চোখে পড়ার মত। তাইতো বারাক ওবামাও তার ভাষণের মধ্যভাগে উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশকে টেনে আনতে কাপর্ন্য করেনি। 

যত হতাশাবদীই হইনা কেন এসব দেখলে বুকটা গর্বেভরে ওঠে। আমার দেশই এখন অন্য অনেক দেশের জন্য উদাহরণ স্বরূপ এটা ভাবতেই ভাললাগার অনুভূতি ছুয়ে যায়। বিশ্বব্যাংক মধ্যম আয়ের দেশকে দুটি শ্রেণীতে ভাগ করেছে একটি হচ্ছে নিম্ন মধ্য আয়ের দেশ আর অন্যটি উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ। বাংলাদেশ এখন নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ বলে পরিচিত হবে। কিন্তু আমরা চাই প্রবৃদ্ধি নির্ভর মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার পাশাপাশি আমরা সামগ্রিক উন্নয়নের পথে অগ্রসর হতে। দেশের ধারাবাহিক অর্থনৈতিক উন্নয়নেরই প্রতিফলন ও স্বীকৃতি এটি। 

জাতি হিসেবে এটি অবশ্যই আমাদের জন্য একটি মাইলফলক ও বড় অর্জন বলে বিবেচিত হতে পারে। মধ্যম আয়ের দেশ মূলত বিশ্ব ব্যাংকের একটি শ্রেণীকরণ ছাড়া তেমন কিছু নয়। বিশ্ব ব্যাংক যেহেতু বিভিন্ন দেশকে অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়ে থাকে তাই এ শ্রেণী করণ। বাংলাদেশ যে শ্রেণীতে আছে এটির নিম্নক্রমে মাথা পিছু আয় হতে হয় ১০৪৫ ডলার এবং সর্বোচ্চ ১২ হাজার ৭৪৫ যলার পর্যন্ত এ সীমা নির্ধারিত। এর বেশি হলে সেটি উচ্চ আয়ের তালিকাতে পড়ে।ভ বাংলাদেশ এ তালিকাতে আসায় বিশ্ব ব্যাংক কর্তৃক বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা প্রাপ্তির বিষয় যেমন অনুকূল হয়েছে বলে অনেকের ধারনা তেমনি মনে রাখা দরকার এটির মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবও লক্ষ্যনীয়। সেই সাথে রয়েছে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ। 

বিশ্ব ব্যাংক এটলাস মেথড নামে একটি নিজস্ব পদ্ধতিতে দেশগুলোকে চারটি ভিন্ন ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করেছে। বিশ্বব্যাংক মূলত কোন দেশের তিন বছরের গড় বিনিময় হারকে সমন্বয় করে,এতে করে আর্ন্তজাতিক মূল্যস্ফীতি ও বিনিময় হারের ওঠানামা সমন্বয় করা সম্ভব হয়। একটি দেশের স্থানীয় মুদ্রায় মোট জাতীয় আয়কে (জিনএনআই) মার্কিন ডলারে রুপান্তর করা হয়। এ কারণে আমরা দেখতে পাই বিশ্ব ব্যাংকের হিসাবের সাথে বাংলাদেশ পরিসংখ্যন ব্যুরো (বিবিএস) এর হিসাবে গরমিল থাকে। বেশ কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ সরকার দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করবে বলে যে পদক্ষেপ নিয়েছে তা নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা হয়েছে এবং সেই পঘে যতটা সম্ভব কাজও হয়েছে। ফলে সরকারের ১০ বছরের প্রেক্ষিত পরিকল্পনায় ২০২১ সালের মধ্যে আজ থেকে ৪৪ বছর আগে স্বাধীনতার স্বাদ পাওয়া এই দেশটি মধ্যম আয়েল দেশ হওয়ার কথা আছে। মধ্যম আয়ের দেশ হওয়া অবশ্যই একটি মর্যাদার বিষয়। 

বিশ্ব ব্যাংক যেহেতু সাহায্য দেওয়ার সবিধার জন্য এ শ্রেনীকরণটি করেছে সুতরাং এই শ্রেণীকরণের মূল উদ্দেশ্য দাড়াচ্ছে সাহায্য প্রদান প্রকল্প। তবে ১৯৬০ সালে যখন প্রথম এলডিসি ধারনাটি নিয়ে বিশ্বে আলোকপাত করা হলো তখন থেকেই বাংলাদেশ এলডিসি ভূক্ত ছিল। যদিও তালিকা প্রণয়ন হয় এগার বছর পর ১৯৭১ সালে ১৮ নভেম্বর যখন বাংলাদেশ স্বাধীনতার দ্বার প্রান্তে দাড়ানো। অবশ্য বাংলাদেশকে তালিকা ভূক্ত করা হয় ১৯৭৫ সালে যে সালটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বেদনাদায়ক স্মৃতিতে ভরপুর। স্বল্পোন্নত দেশের সেই তালিকা থেকে বেরিয়ে আসার আপ্রাণ চেষ্টা ছিল বাংলাদেশ নামক ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের। আর সে লক্ষ্যেই সরকার কাজ করে যাচ্ছে। 

এখন বাংলাদেশের অর্থনীতি যেভাবে এগোচ্ছে সে ধারায় এগোলে বাংলাদেশ সরকার গৃহীত লক্ষ্যমাত্রা ২০২১ সালে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হবেনা। সূচকে দেখা গেছে বাংলাদেশের বর্তমান মাথাপিছু আয় ১০৮০ মার্কিন ডলার। কিন্তু এলডিসি থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে হলে প্রয়োজন হবে ১২৪২ মার্কিন ডলার। সুতরাং লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিকে আরো বাড়াতে হবে। বর্তমানে দেশে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ৬.২ শতাংশ যা লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য যথেষ্ট নয়। সে ক্ষেত্রে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার বাড়িয়ে ৭.৫ থেকে ৮ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন বিনিয়োগ বাড়াতে হবে জিডিপির আরও ৫ শতাংশ হারে এবং সেই সাথে প্রবাসী আয়ে প্রবৃদ্ধি রাখতে হবে ৮ শতাংশ। 

এটি অর্জিত হলে বাংলাদেশ উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ থেকে বানিজ্য ক্ষেত্রে বাজার সুবিধা পাবে। ২০০৬ সালে গবেষণা সংস্থা “সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)” রুপকল্প তৈরি করে স্বাধীনতার ৫০ তম বছরে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার স্বপ্ন দেখিয়েছিল যা সরকারকে সে পথে হাটতে অনুপ্রাণিত করেছে। আর তাই আরো একধাপ সাহসী হয়ে সরকার ঘোষণা করেছে ২০২১ সালে সে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে এবং দেশের প্রবৃদ্ধির হার হবে ১০ শতাংশ সেই সাথে মাথাপিছু আয় হবে ২ হাজার ডলার যা পাশ্ববর্তী দেশের মাথাপিছু আয়ের অধিক। বাংলাদেশ এ যাত্রায় অগ্রগামি পথিক হয়েছে কিছু বলিষ্ঠ কমকান্ডের মাধ্যমে। 

শিশুদের স্কুলে যাওয়া,কার্বন নিঃসরণ কমানো,শিশু মৃত্যুর হার কমানো,দারিদ্রতা কমিয়ে আনার পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যায় নিম্নমূখী করা বাংলাদেশের অগ্রগতির মূল রহস্য। তবে এটুকুতেই আত্মতুষ্টিতে ভোগার কোন সুযোগ নেই। ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হবে এবং সময়ের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশকে আগামীতে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে যার প্রস্তুতি নিতে হবে এখন থেকেই। পুষ্টি,স্বাস্থ্য,শিশুদের স্কুলে ভর্তি এবং শিক্ষার হারের সমন্বয় আনতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ,জনসংখ্যা বৃদ্ধির পরিমান হ্রাস সহ বিশ্ববাজার থেকে দূরত্ব হ্রাসের জন্য ঐক্যমতের সমাজ গঠন করতে হবে। একটা দেশকে কারো একার পক্ষে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় এমনকি সেটা সরকারের একার পক্ষেও সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করতে হবে। 

যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন সাধন এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও মজুরী আর্ন্তজাতিক মানের করা গেলে বিদেশী বিনিয়োগ বৃদি।ধ পাবে যা আমাদের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে। রাজনৈতিক অস্থিরতা কমিয়ে আনতে হবে। আশার কথা হচ্ছে বিরোধী দলগুলো তাদের সহিংস মনোভাব থেকে কিছুটা হলেও বেরিয়ে আসতে পেরেছে যা দেশের সার্বিক পরিস্থিতি উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। সে ক্ষেত্রৈ সরকারকে তাদের প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মানসিকতা রাখতে হবে। সবার সর্বাত্মক প্রচেষ্টাই রুপকল্পকে রুপকথার রাজ্য থেকে বাস্তবে নিয়ে আসতে পারে। সুতরাং আমরা আশা করতে পারি স্বাধীনতার ৫০ বছর পুর্তির সময় আমাদের দেশটা হবে এমন একটি দেশ যে দেশটিকে সবাই মিলে এগিয়ে নিয়ে যাবে।