ধূসর রঙের ক্যানভাস

ধুসর রঙের ক্যানভাস
..............................................
প্রিয় মানুষের কথা লিখতে বলছো
সে এখন দেয়ালে টাঙ্গানো ধুলোর আস্তরনে ঢাকা ছবির মত
চা খেতে খেতে ইচ্ছে হলেও তাকে আর ছুঁয়ে দেখা হয়না।

আমার কলমের কালিতে সে আজ শুস্ক পংক্তিমালা
কৃষ্ণচূড়ার লাল ফুলগুলি শুকিয়ে যাওয়ার মত
থাক সে দেয়ালের ঝুলন্ত ছবি হয়ে।
ছবিটা আমার নিজের হাতে আঁকা স্বপ্ন ক্যানভাস
সবটুকু রঙের কাজ শেষ করা হয়নি,
তার আগেই দেয়ালের ঝুলন্ত ছবি হয়ে গেছে।
আগের মত কোন চাঁদ জাগা রাতের শেষে
কিংবা ফাগুনের কালে তাকে মনে পড়েনা
মনের ক্যানভাসটা ধুসর রঙে মিলিয়ে যাচ্ছে।
ছবির মানুষ সে ছবি হয়ে থাক
শ্রান্ত দুপুরে কিংবা কাক ডাকা ভোরে এসে
তাকে আমি একবার করে দেখে যাব।

রিকশা ওয়ালা




                   

পুলিশ কনস্টেবলের চাকরি নেওয়ার পর ভাল কিছু চোখেই পড়েনা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পযর্ন্ত মাটিতে পা ঠুকে স্যালুট করে জুতার তলা ক্ষয় হয়ে যায়।সব থেকে ছোট পদের চাকুরীতে এই এক সমস্যা, যেই আসুক সে অবধারিত ভাবেই সিনিয়র পোষ্টেরই হবেন এবং তাকে স্যালুট দিতেই হবে।স্যালুট দিতে কোন অসুবিধা নেই। ওটাই যেহেতু দায়িত্ব তবে নিষ্ঠার সাথে তা কর্তব্য কাজ বলেই পালন করে আসছি। থানা হাজতে হলে কিছুটা আরামে ঘুমিয়ে কাটানোর সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা থাকতো। কিন্তু ঐ যে ভাগ্যে ফেরে পোষ্টিং হয়েছে পুলিশ সুপারের কাযার্লয়ে।তাই আরাম,ঘুম, বসাতো দুরের কথা  মাটিতে পা ঠুকার ও অবসর মেলেনা। তার ওপর যে পারে সেই কথা শোনায়। নিম্ন পদে চাকুরী করবো কথা শোনা ছাড়া উপায় কি। কিন্তু সেই কথা সহ্য করার ক্ষমতা সবার থাকে না। তিন বছরে তাই আঠারো বার বদলী হতে হয় তবারকের। তবারক ক’দিন হলো বদলী হয়ে রংপুর চলে গেছে।সেও অবশ্য আমার মতই কনস্টেবলই ছিল। কথা তার মোটেই সহ্য হতনা,ফলে কদিন যেতে না যেতেই উপর মহল তাকে বদলী করে দিত। আমার সব গা সওয়া হয়ে গেছে। সব থেকে ভয় পাই যখন পুলিশ সুপার স্যার বদলী হন। বার বার মনে হয় যিনি ছিলেন তার সাথে কোন না কোন ভাবে মানিয়ে নিয়েছি কিন্তু যিনি আসবেন তার সাথে কি মানিয়ে নিতে পারবো।

আজ নতুন পুলিশ সুপার স্যারের আসার কথা। মনে মনে সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। আমার স্ত্রী নিজ হাতে জুতা পরিস্কার করে দিয়েছে। বাইরে থেকে জুতা কালি করার মত বিলাসীতা করার সাহস আমার বা আমার স্ত্রীর হয়নি কখনো। সংসার টিকে আছে স্ত্রীর গুনে। মাস শেষে যে বেতন পাই তা স্ত্রীর হাতে তুলে দিয়ে চিন্তা মুক্ত হই। খেয়ে না খেয়ে হলেও সে কীভাবে যেন মাসটা পার করে দেয়।নতুন পুলিশ সুপার স্যার আসবেন শুনলেই সে কিছু না কিছু রেধে জোর করে দিয়ে দেয়। কিন্তু সাহসের অভাবে তা নতুন পুলিশ সুপার স্যার পযর্ন্ত পৌছানো হয়না। কিংবা সত্যি বলতে তার পযর্ন্ত পৌছানেরা আগেই অন্যরা তা চেটেপুটে শেষ করে।যুক্তির অভাব নেই তাদের। তারা মনে করে পুলিশ সুপার চাইলেই এর থেকে ভাল খাবার খেতে পারবেন কিন্তু তারা চাইলেও খেতে পারবেনা।

বিগত তিন বছর তিনজন পুলিশ সুপারের অধীনে চাকুরী করেছি। আজ আবার যখন নতুন পুলিশ সুপার আসবেন বলে শুনেছে তখন আমার স্ত্রী ঠিকই নিয়ম করে খাবার তৈরি করে দিয়েছিল। কিন্তু সে যেমন নিয়ম ভাঙেনি তেমনি নিয়ম ভাঙেনি অফিসের অন্যরাও।সকালে অফিসে আসার পরই সব খাবার শেষ করেছে। তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বলেছে, ভাবির রান্নার হাত অসাধারণ! শুধু ভাগ্যই খারাপ এমন অসাধারণ যার রান্নার হাত সে কেন পুলিশ কনস্টেবলের ঘরে থাকবে। তারতো থাকার কথা রাজ পরিবারের রাধুনী হিসেবে। আমি মনে মনে বলি উপমার কি ঢং! রাজপরিবারের রাধুনী!! কেন! রাজকন্যা বা রাজরানী ভাবা যেতনা?


আজকাল মানুষ মানুষকে ছোটলোক ভাবতেই বেশি পছন্দ করে।সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে কখন যে নয়টা বেজে গেছে টেরই পাইনি।স্যারের এতোক্ষণে চলে আসার কথা কিন্তু স্যার আসছেন না কেন বুঝে উঠতে পারছিনা। স্যারের গাড়ির হর্ণ শুনবো বলে দুই কান খাড়া করে রেখেছি।সময় চলে যাচ্ছে কিন্তু স্যারের গাড়ি আসছেনা। স্যারকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য এএসপি মহিবুল স্যার আগেই চলে এসেছেন।তিনি বার কয় এসে উকে মেরে গেছেন।সাত পাঁচ ভাবছি এমন সময় অফিসের সামনে টুংটাং শব্দ করতে করতে একটা রিকশা এসে থামলো।বয়স্ক এক রিকশা ওয়ালা শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে রিকশা চালিয়ে এসেছে এটা তার কপালে জমে থাকা ঘাম দেখেই বোঝা যায়। রিকশা থেকে যে যাত্রী নামলেন তিনি অল্প বয়সী। রিকশা থেকে নামতেই তার দিকে চোখ পড়লো। আমার পা আপনা আপনি উঠে গেল উচুতে আর ডান হাত উঠলো কপালে। পা ঠুকে স্যালুট করতে দেরি হয়নি আমার। তার কাধের অ্যাপুলেটই আমাকে স্যালুট করতে বাধ্য করলো। তিনিই যে আমাদের নতুন পুলিশ সুপার তাতে কোন সন্দেহ নেই।

কিন্তু বিস্মিত হয়েছি গাড়ির পরিবর্তে রিকশা করে আসতে দেখে। মনে মনে যুক্তি দাড় করিয়েছি যে, নিশ্চই স্যারের গাড়ি রাস্তায় নষ্ট হয়েছে তাই স্যার সময় মত অফিসে আসার জন্যই রিকশায় উঠেছেন।
রিকশা থেকে নেমে তিনি মানিব্যাগ বের করে রিকশা ওয়ালার ভাড়া দিলেন। রিকশা ওয়ালা টাকা গুনে দেখে বললো স্যার আরো পাঁচ টাকা দেন।আমার মনে হচ্ছিল গিয়ে ব্যাটাকে আচ্ছা একটা ধমক দেই। পুলিশ সুপারের কাছে ভাড়া নিয়ে কথা বলছে। কিন্তু স্যারের সাথেতো এখনো কথাই হলনা সেখানে অমন কিছু করার সুযোগ কোথায়।স্যার বললেন এই টুকু মাত্র পথ! ত্রিশ টাকা দিলাম তার পরও পাঁচ টাকা বেশি চাচ্ছেন? রিকশা ওয়ালা বললেন, কপালের ঘামের দিকে তাকিয়ে দেখুন ওটা কষ্টের টাকা, তাই ন্যায্য ভাড়াই চাইছি।পুলিশ সুপার স্যার রিকশা ওয়ালাকে আরো পাঁচ টাকা  ধরিয়ে দিলেন। রিকশা ওয়ালার মুখটা হাসিতে ভরে উঠলো।যেন তার মূখে ফুটে উঠেছে বিজয়ের হাসি।

বিনা মেঘে শুনেছি বজ্রপাত হয়। জীবনে সেদিনই প্রথম সেটার চাক্ষুস স্বাক্ষী হলাম। ভাড়া মেটানোর পর পুলিশ সুপার স্যার একটু থামলেন। রিকশা ওয়ালা তখনও দাড়িয়ে আছে। বুঝতে পারছিনা ব্যাটার মতলবটা কি? ভাড়া পেয়েছে এবার মানে মানে কেটে পড়ো কিন্তু সে দাড়িয়েই আছে। পুলিশ সুপার স্যার হাতের ঘড়ি দেখলেন। তার পর রিকশা ওয়ালার দিকে এগিয়ে গেলেন।মনে মনে ভাবলাম বেশি ভাড়া দাবী করার কারণে এবার দু একটা চড় থাপ্পড় নিশ্চই দিবেন। কিন্তু আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো যখন দেখলাম পুলিশ সুপার স্যার নিজের পকেটে রাখা রুমালটা বের করে বৃদ্ধ রিকশা ওয়ালার কপালে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘাম মুছে দিলেন।শরীরে চিমটি কেটে দেখলাম আমি স্বপ্ন দেখছিনাতো!নাহ সেটা স্বপ্ন ছিলনা।রিকশা ওয়ালার ঘামে ভেজা রুমালটা পরম মমতায় পকেটে ভরে পুলিশ সুপার স্যার নিচু হলেন। 

আমার স্বল্প বুদ্ধির মাথাটা পুরো পুরি এলোমেলো করে দিয়ে সেই মাথার উপর আকাশ পাতাল সব ভেঙ্গে দিয়ে পুলিশ সুপার স্যারের দুই হাত চলে গেল তাকে বয়ে নিয়ে আসা বৃদ্ধ রিকশা ওয়ালার পায়ে। কয়েকবার পা ছুয়ে সালাম করার পর বৃদ্ধ রিকশা ওয়ালা স্যারকে ওঠালেন।স্যারের কপালে একটা চুমু দিয়ে রিকশা নিয়ে ফিরে গেলেন। যতক্ষণ সে চোখের আড়ালে মিলিয়ে না গেল ততোক্ষণ স্যার ঠায় দাড়িয়ে থাকলেন। তার পর তাকিয়ে দেখি একসময় স্যারও সেখানে নেই। যেন ভোজবাজির মত মিলিয়ে গেছে।মনে হলো যা দেখেছি সব স্বপ্ন ছিল। ক্লান্তি আর একঘেয়েমি দিবালোকেও চোখে অলীক স্বপ্ন নিয়ে এসেছে। পরক্ষণেই সজোরে স্যালুটের শব্দ ভেসে আসলো।গেট ছেড়ে ক্ষণিকের জন্য ভিতরে উকি দিয়ে দেখলাম নাহ! সত্যি সত্যিই স্যার ভিতরে আছেন।

    অভাবনীয় দৃশ্য দেখে আমি এতোটাই স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম যে, স্যার কখন ভিতরে প্রবেশ করেছিলেন তা টেরই পাইনি।এটা বড় ধরনের অন্যায় হয়েছে।কিন্তু শাস্তি পাওয়ার কোন ভয় মনে কাজ করছেনা। যে স্যার রিকশা ওয়ালার কপালের ঘাম নিজ রুমাল দিয়ে মুছে দিতে পারেন তিনি আর যাই হোক নিশ্চই শাস্তি দিবেন বলে মনে হয়না।রিকশা ওয়ালার ঘটনাটা আমি ছাড়া আর কারো চোখে পড়েনি।আমার স্ত্রী যে খাবার পাঠিয়েছিল সেটার জন্য আফসোস হলো। এর আগে যখন খাবারগুলো অন্যরা ভাগ করে খেয়েছে তখন আফসোস হয়নি কিন্তু আজ আফসোস হল। এমন একজন মানুষকে খাওয়াতে না পারার দুঃখ সত্যিই ভুলার নয়। সেদিন স্যার সবাইকে ডেকে নিয়ে পরিচিত হলেন। আমার দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। সেই তাকানোর মধ্যে মমতা ছিল নাকি ক্ষোভ তা জানিনা।

রাতে খেতে বসে স্ত্রীকে ঘটনাটা বললাম। আমার বলা শেষ হওয়ার আগেই সে উঠে চলে গেল। এখানে রাগ করার কি আছে বুঝিনি।আমি যে স্যারকে তার রান্না করা খাবার দেইনি সেটাওতো বলিনি। শেষে একা একা বসেই খাবার শেষ করে রুমে গিয়ে দেখি তারানা কাঁদছে। আমার স্ত্রীর নাম তারানা। আমি তার পাশে বসে তাকে শান্তনার সুরে বললাম, আমি কি এমন বলেছি যে তাতে কাঁদতে হবে? তারানা চোখ মুছতে মুছতে বললো, অমন একটা ভাল মানুষের ওরকম ভালমানুষি ঘটনা শুনে যারা কাঁদেনা তারা পাষান!।বুঝলাম আবেগেই কেঁদে ফেলেছে আমার স্ত্রী।তার ভাষায় আমিও পাষান। খাবার যে দেওয়া হয়নি এটা বলার সাহস হলোনা আমার।তার কান্না হয়তো থামবেই না। কি জানি হয়েছিল আমার। স্ত্রীকে বললাম নতুন স্যারের জন্য তোমার জীবনের সেরা রান্নাটা কি করবে কালকে?তারানা যেন সেই রাতেই রান্নার সব কিছু রেডি করে রাখলো।একটি বারও প্রশ্ন করলো না একই স্যারকে দুবার কেন রান্না করে খাওয়াতে হবে।

পরদিন ভোরে স্ত্রীর রান্না করা পায়েশ নিয়ে গেলাম স্যারের জন্য।আজ আর কোন ভাবেই সেটা কারো নজরে পড়তে দেইনি।অপেক্ষায় আছি স্যারকে বয়ে নিয়ে আসা রিকশার টুংটাং শব্দের কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে স্যার এলেন তার জন্য বরাদ্দ অফিসের গাড়িতে। সোজা চলে গেলেন নিজের রুমে।মনটা খারাপ হয়ে গেল। ভেবেছিলাম স্যার হয়তো রিকশাতেই আসবেন।আমার যেমন গাড়ি নেই স্যারও তেমন রিকশায় চড়েন। তার মানে সমানে সমান।কিন্তু সব মিথ্যে করে দিয়ে স্যার গাড়িতেই আসলেন। ভাবলাম থাক পায়েশটুকু স্যারকে দিয়ে আর লাভ কী!তার চেয়ে নিজে খেয়ে নিলেই ভাল।দুপুরে সত্যি সত্যিই পায়েশটুকু নিজে খেয়ে তৃপ্তীর ঢেকুর তুললাম।মনে মনে তারানার প্রশংসা করলাম যে, আমার মত পুলিশ কনস্টেবলের ঘরে তাকে মানায় না। তার রাজরানী হওয়া উচিত ছিল।আবার ভাবলাম যাহ রাজরানীরা কি কখনো রান্না করে নাকি?তখন মনে হলো অফিসের অন্যদের উপমাটাই ঠিক ছিল। রাজ প্রাসাদের রাধুনী হওয়াই উচিত ছিল তার।

যে মানুষ প্রথম দিন রিকশায় অফিসে এসে নিজের রুমাল দিয়ে রিকশা ওয়ালার ঘাম মুছে দিয়ে আমার মন জয় করে নিয়েছিল সেই তিনিই রাতের ব্যাবধানে আমার মন থকে উধাও হয়ে গেলেন। ব্যবধান কি তবে ঐ রিকশা আর অফিসের গাড়িই ছিল কিনা জানিনা।দুপুরের পর স্যারের রুমে আমার ডাক পড়লো।মনে মনে প্রস্তুতি নিলাম গতদিন স্যারকে সময় মত সম্মান দেখাতে পারিনি নিশ্চই আজ তার শাস্তি পাব।

অনুমতি নিয়ে স্যারের রুমে ঢুকলাম।পিছনে ফিরে ছিলেন বলে তিনি কি করছেন তা দেখতে পাইনি। পরে দেখলাম একটা বাঁধাই করা ছবি কাপড় দিয়ে মুছে টেবিলের একপাশে রাখলেন। সেদিকে আমার চোখটা আটকে গেল।সেই রিকশা ওয়ালার ছবি!! সম্ভবত গতদিন আমার মাথায় শুধু একটা আসমান ভেঙে পড়েছিল আর আজ ভেঙে পড়েছে বাকি ছয়টা আসমান। কোন দিন ভাবিনি আমারও চক্ষু ছানাবড়া হবে।আমার চোখে কি জিজ্ঞাসু দৃষ্টি ছিল? স্যার মুচকি হাসি দিয়ে বললেন, আমার বাবার ছবি!! জন্মের পর থেকে বাবাকে রিকশা চালাতে দেখেছি।রিকশা চালিয়ে আজ আমাকে পুলিশ সুপার বানিয়েছেন। আমি পুলিশে চাকরি পাওয়ার পর বাবা রিকশা চালান না। শুধু নতুন কোন অফিসে জয়েন করতে গেলে বাবা নিজে ছেলেকে রিকশা চালিয়ে নিয়ে আসেন। দামাদামি করে ভাড়া নেন।স্কুল কলেজেও বাবার রিকশাতেই যেতাম আমি।বাবা নিজের রিকশাটা এখনো যত্ন করে রেখে দিয়েছেন।তার ইচ্ছা নাতি নাতনিদেরও তিনি নিজের রিকশায় চড়াবেন।

স্যারের কথা শুনে আমার চোখ ভিজে উঠলো।ওখানে দাড়িয়ে থাকা সম্ভব নয়।অনুমতি নিয়ে বেরিয়ে এলাম। তারানা থাকলে বুক ফুলিয়ে বলতে পারতাম, দেখ আমি পাষাণ নই। মনে মনে নিজেকে ধিক্কার দিলাম। যত্ন করে রান্না করা পায়েশটুকু কেন এই মানুষটিকে না খাইয়ে নিজে খেয়েছি। আমি যে আহাম্মক তা এখন ভালই বুঝেছি।সেদিনও রাতে খেতে বসে আমার স্ত্রী নতুন স্যারের প্রসঙ্গ তুলে জানতে চাইলো স্যারকে আজ কেমন দেখলে?আমি কোন উত্তর দেইনি।উত্তর দেয়ার মত ভাষা আমার জানা নেই।শুধু বলেছি তারানা কালকে আর একবার প্লিজ স্যারের জন্য বিশেষ কিছু রান্না করবে?! তারানা আমার মূখের দিকে তাকিয়ে আছে। যেমনটা আমি তাকিয়ে ছিলাম পুলিশ সুপারের টেবিলের কোনায় রাখা ছবিটার দিকে।ছবিটা ছিল একজন রিকশাওয়ালার।
……………………….


ইমেইলঃ zazafee@yahoo.com
৩ মে ২০১৬

পৃথিবীতে শান্তি বিরাজ করুক



(লেখাটি দৈনিক ইত্তেফাকের উপসম্পাদকীয়তে প্রকাশিত)
জাজাফী

সম্প্রতি ফ্রান্সে যে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ঘটেছে তা নিয়ে সারা বিশ্বে নিন্দা ক্ষোভ প্রকাশের মহড়া দেখা গেছে।সেই ধারা অব্যাহত ছিল বাংলাদেশীদের মধ্যেও। এটা অবশ্যই স্বাভাবিক যে,যে কোন সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে আমরা অবস্থান করবো এবং ওগুলোকে ঘৃণা করবো।
এই ঘৃণা প্রকাশের রীতি বহুপুরাতন হলেও এখন নতুন ভাবে সেটা প্রকাশ হচ্ছে। এবং সব কিছুকে ছাড়িয়ে গেছে ফেসবুক নামক আজব দুনিয়ার আগমনের মাধ্যমে।ফ্রান্সে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় যখন গোটা বিশ্ব ক্ষোভে ফেটে পড়ছে তখন ফেসবুক একটা অ্যাপস বানিয়েছে যার মাধ্যমে ফ্রান্সকে সাপোর্ট করার জন্য নিজের ফেসবুক প্রোফাইলের ছবিটি ফ্রান্সের পতাকার আদলে রাঙিয়ে নেওয়া যাবে। আর এটা ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে যে কোন মহামারির থেকেও দ্রুত গতিতে।
 
যদি ১৪৯ কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারীর মধ্যে কমপক্ষে ৮০ কোটি ব্যবহারকারী এটা করেছে।কিন্তু আমাদের কাছে মোটেও বোধগম্য হয়নি যে ফ্রান্সে সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদ স্বরুপ ফ্রান্সের পতাকায় নিজের ফেসবুক প্রোফাইল রাঙিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে কিভাবে প্রতিবাদ করা হলো বা ফ্রান্সকে কিসের ব্যাপারে সাপোর্ট করা হলো।ধরে নেওয়া যাক যে এটা একটা অভিনব পন্থা এবং সত্যি সত্যি কেউ যদি তার ফেসবুক প্রোফাইল ফ্রান্সের পতাকার রঙে রাঙিয়ে নেয় তবে সে ফ্রান্সে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনার নিন্দা জানাতেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে।

এখানেই অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন এই বলে যে গোটা বিশ্বে, বিশেষ করে সিরিয়া,আফগানস্থান আর ফিলিস্তিনে দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম নিধন চলছে,কিংবা মুসলিম নিধনের সাথে সাথে সেই সব হামলায় অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও মারা যাচ্ছে আর তা হিসাব করলে ফ্রান্সের হামলায় যতজন মারা গেছে তার থেকে কয়েক হাজার গুন বেশি। সেই সব হামলার প্রতিবাদেতো কেউ কোন দিন সেই সব দেশের পতাকার রঙে নিজেদের ফেসবুক প্রোফাইল পরিবর্তন করেনি।

রানা প্লাজা ধ্বসে অনেক মানুষ মারা গেছে যদিও সেটা দুর্ঘটনা ছিল তার পরও সেটার সমব্যাথী হয়ে কেউতো ওভাবে বাংলাদেশের পতাকায় নিজেদের প্রোফাইল রাঙায়নি। নাকি তখন ফেসবুক ছিলনা?পিনাক নামক লঞ্চ ডুবে যখন অনেক মানুষের প্রাণহানি ঘটলো তখনো বাঙ্গালীরা নিশ্চুপ ছিল অন্তত ফেসবুকীয় আঙ্গিনায়।একেই বলে হুজুগে বাঙ্গালী।

ফেসবুক প্রোফাইলে পতাকার রঙে রাঙ্গালেই যদি প্রতিবাদ করা হয় কিংবা সাপোর্ট করা হয় তবে আমরা অবশ্যই সেটাকে সমর্থন করি। কিন্তু কেন সেটা সব দেশ ও জাতির জন্য প্রযোজ্য নয় সেটাই আমাদের প্রশ্ন।সিরিয়া,আফগানস্তান বা ফিলিস্তিনে ইসরাইলকর্তৃক হামলায় হাজার হাজার নারী পুরুষ ও শিশু মারা গেলে আমরা প্রতিবাদ করতে পারিনা কিন্তু ফ্রান্সের ঘটনায় প্রতিবাদের নামে নাটক করি।
আজব এক যুগে এসে পড়েছি আমরা যেখানকার মানুষগুলো আজব এবং তাদের কর্মকান্ডও অদ্ভুত।ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন যে কোন মূল্যে তারা আইএস নিধন করবে।অথচ আইএস এর উত্থান কিন্তু অনেক আগেই হয়েছে এবং তারা সারাবিশ্বে আরো অনেক দেশে তাদের নির্মম হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে তখন ফ্রান্স ছিল নিষ্কৃয় দর্শক । এই ধরনের মানুষ বাংলাদেশেও অহরহ দেখা যায়। যাদেরকে আমরা হুজুগে বাঙ্গালী বলে থাকি।
 
একদল মানুষ যারা ফ্রান্সের সন্ত্রাসী হামলার পর ফ্রান্সের পতাকায় নিজেদের ফেসবুক প্রোফাইল রাঙিয়েছে তাদেরই মত একদল একসময় চাঁদের বুকে সাইদীর ছবি দেখে নিজেদের ফেসবুক প্রোফাইল রাঙিয়েছিল।পৃথিবীর আনাচে কানাচে প্রতিনিয়ত কোন না কোন সন্ত্রাসী হামলা হচ্ছে। মালয়েশিয়ার বোয়িং বিমান যখন দুইশোর অধিক যাত্রী নিয়ে আজীবনের মত হারিয়ে গেল তখন কিন্তু আমরা সমব্যাথী হয়ে আমাদের ফেসবুক প্রোফাইল মালয়েশিয়া বা অন্য কোন দেশের পতাকার রঙে রাঙাইনি।
 
এখন যুগটাই চলছে এরকম। হঠাৎ কেউ কোন একটা কিছুর প্রচলন শুরু করে দিলেই সেটা নিয়ে আমরা মাতোয়ারা হয়ে যাই। এই যেমন হঠাৎ করে সেলফী ভাইরাসের আক্রান্ত হয়ে পড়লে সারা বিশ্ব। অথচ সেলফীর প্রচলনের অনেক আগেও মানুষ সেফলী তুলতো। তখন হয়তো ওটার নাম সেলফী হয়ে ওঠেনি।
আমরা অবশ্যই ফ্রান্সে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা জানাই। সেই সাথে আমাদের উচিত পৃথিবীর যে কোন দেশের যে কোন সন্ত্রাসী কর্মকান্ডকে ঘৃণা করা।আমাদের সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনতে হবে।আমাদের একটাই কাম্য “পৃথিবীতে শান্তি বিরাজ করুক”।
……………………………………………………………………………………………

দূরের সৌন্দর্য

(লেখাটি দৈনিক ইত্তেফাকের উপসম্পাদকীয়তে ছাপা হলো ৩১ মার্চ ২০১৬)
#জাজাফী

একটু ভেবে দেখুন হয়তো আপনার ঘরের পুব দিকের জানালাটা খুললেই ফুরফুরে বাতাস আপনাকে মুহুর্তেই শীতল করে দেয়।বাইরে তাকাতেই আদিগন্ত খোলা মাঠ,নীল আকাশ।রোজ সকালে একবার করে আপনার ঘুম ভাঙ্গে জানালা দিয়ে আসা সুযের্রর মিষ্টি আলোয়।কিন্তু সেই ভোরের সুর্যটা যখন মিষ্টি আলো ছড়াতে ছড়াতে পুব আকাশে উকি মারে তখন কখনো কি আয়োজন করে সেটার দিকে তাকিয়েছেন? কিংবা হতেও পারে আপনার রুমটি পশ্চিম দিকে খোলা জানালা ধরে তাকালেই রোজ একটু একটু করে সুযের্র তলিয়ে যাওয়া দেখতে পান। পুরো পৃথিবীকে অন্ধকার করে দিয়ে সে হারিয়ে যায়।তখন নিশ্চই আপনি আয়োজন করে সুর্যর হারিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখেন নি। কিন্তু সেই আপনিই কত আয়োজন করে কুয়াকাটাতে যাচ্ছেন সুয উদয় অস্ত দেখতে কিংবা কক্সবাজার যাচ্ছেন সুযের ডুবে যাওয়া দেখতে।

আকাশেতো একটাই সুয, সেই সুযটাইতো আপনার ঘরের জানালা বরাবর উদয় হয়ে দিন শেষে অস্ত যায়। আবার সেই সুযটাইতো কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের ওপাশে উদয় হয়ে অস্ত যায়। কিন্তু আপনার জানালায় উকি দেয়া সুর্যটা আপনাকে টানেনা, কিন্তু কুয়াকাটার সুয আপনাকে টানে।

না পাওয়ার পিছনে ছুটতেই আমরা ভালবাসি।যেটা আপনা আপনি পদতলে লুটিয়ে পড়ে থাকে আমরা সেটাকে অবহেলা করি, কখনোই তুলে নেই না।ওপারেতে যত সুখ আমার বিশ্বাসকে পুজি করেই আমাদের বেঁচে থাকা।সুদুর ইতালির ভেনিস নগরীর কংক্রিটের সৌন্দয আমাদের মোহাচ্ছন্ন করে কিন্তু গাজিপুরের শালবাগান আমাদের টানেনা।ভোলার মনপুরা দ্বীপ আমাদের টানেনা।

আপনার খুব বিপদের সময় হয়তো কাউকে ফোন করেছেন একবার দুবার বার বার। কিন্তু ওপাশের ব্যক্তিটি ফোন রিসিভ করছেনা। এমনকি কেটেও দিচ্ছেনা।আপনার খুব বিরক্ত লাগছে। মনে মনে ভাবছেন সে আপনাকে তাচ্ছিল্যের চোখে দেখছে, অবহেলা করছে। ভাবছেন তার সাথে সম্পর্কই ছিন্ন করবেন। প্রকৃত পক্ষে সেটা নাওতো হতে পারে।আধুনিক এই যুগে মানুষ বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করছে। কেউ কোন মত খেয়ে পরে বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করছে, আবার কেউবা পাহাড় সমান সম্পদ থাকার পরও হিমালয়ের মত উচু হওয়ার জন্য সংগ্রাম করছে। ব্যাস্ততাই আজ আমাদের অনেক কিছু থেকে বিমুখ করে রেখেছে। সে জন্যই হয়তো আপনি আমি যাকে ফোন করছি তার নজরেই আসছেনা যে কেউ একজন তাকে ফোন করেই যাচ্ছে।

ব্যস্ততা যে মানুষকে কতটা বেখেয়াল করে দেয় তার অনেক উদাহরণ দেয়া যায়।ওয়াশিংটন মেট্রো রেল স্ট্রেশান।সকাল থেকেই হাজার হাজার কর্মব্যস্ত মানুষের ভীড়। রেল ক্রসিংএর জন্য যে ওভার ব্রিজটা আছে তার সিড়ির পাশেই দাড়িয়ে ছিলাম।অপেক্ষা ট্রেন আসার জন্য।একজন বয়স্ক লোক একটা হুইল চেয়ার ঠেলে নিয়ে এসে থামলো সিড়ির পাশে। হুইল চেয়ার থেকে একজনকে ধরে ধরে সিড়ির পাশে বসিয়ে দিল।লোকটার মাথায় একটা সাদামাটা ক্যাপ।হাতে একটা বেহালা।চোখে একটা সাদামাটা চশমা। হতেও পারে লোকটা অন্ধ। যে তাকে নামিয়ে দিতে এসেছিল সে হুইল চেয়ারটা ঠেলে ঠেলে চলে গেল।বেহালা হাতে লোকটি একে একে সুর তুলতে লাগলো। মাথার ক্যাপটি সামনে মেলে ধরলো।বুঝলাম নেহায়েত কোন ভিখারী। ওই দেশে ভিক্ষুকও কোন না কোন সৃজনশীলতা দেখিয়ে তবেই ভিক্ষা করে।হাজার হাজার মানুষ ব্যস্ত হয়ে ছুটে চলেছে নিজ নিজ গন্তব্যে। বেহালা বাদক একের পর এক সুর তুলছে।কখনো বেদনার, কখনো আনন্দের।কারো সেদিকে তাকাবার সময়ই যেন নেই।

একজন মধ্য বয়সী মহিলা যেতে যেতে তার ক্যাপের দিকে এক ডলার ছুড়ে দিল।তার পর আরো অনেক ক্ষন।আমার ট্রেনে ওঠা হলোনা। তার সুর আমাকে মুগ্ধ করলো, তার চেয়েও আমি বেশি কৌতুহলী ছিলাম তার ক্যাপে কত ডলার পড়ে সেটা দেখার জন্য।একটা ছোট্ট বাচ্চা অনেক ক্ষণ তার দিকে অপলোক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল।কত মানুষ গেল কত মানুষ আসলো কিন্তু তার সেই সুর কারো আমলেই আসলোনা। কেউ তার দিকে গুরুত্ব দিয়ে তাকালানা পযর্ন্ত। সবার কাছে তার বেহালার সুর যেন কোন ট্রামের সাইরেনের মতই যে বাজছে বাজুক কানে এসে লাগুক তাতে কার কি আসে যায়। দিন শেষে সেই বেহালাবাদকের ক্যাপে ৩২ ডলার জমা হলো।কিছুক্ষণ পর যে তাকে নামিয়ে দিয়ে গেছিল সে আবার ফিরে আসলো।

নাহ তার সাথে কোন হুইল চেয়ার নেই। বেহালা বাদক এবার নিজেই উঠে দাড়ালেন।তার হাত থেকে বেহালাটিও লোকটি নিজে নিয়ে নিল।চোখ থেকে চশমাটা খুলে ফেলার পর আমি অবাক চোখে তাকিয়ে দেখলাম একটু আগেই বেহালা বাজিয়ে ভিক্ষা করা লোকটিকে। ঘন্টার পর ঘন্টা দাড়িয়ে থেকেও যাকে আমি চিনতে পারিনি এবং আমার মত হাজার হাজার মানুষ চিনতে পারেনি সেই তাকেই মাত্র এক মিনিটেই চিনতে পারলাম। তিনি আর কেউ নন, তিনি বিশ্বের সবর্কালের শ্রেষ্ঠ বেহালা বাদকদের একজন, জোসুয়া বেল!!!

যার এক একটা কনসার্টে যেতে হলে সবর্নিম্ন টিকেটের দাম থাকে ১০০ ডলার! সেই জোসুয়া বেল যখন একটা ব্যস্ত মেট্রো স্টেশানের ওভার ব্রিজের নিচেয় বসে ভিক্ষুকের মত ভিক্ষার জন্য একই সুর বাজিয়ে ছিলেন তখন মানুষের তার দিকে নজর দেবার সময় ছিলনা।সারা দিনে যার আয় হয়েছে মাত্র ৩২ ডলার।

আমরা আসলে এরকমই ব্যস্ত হয়ে পড়েছি যে ব্যস্ততার কারণে জীবনের অনেক কিছু আমাদের চোখের আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। সাধারণ সময়,অনুপোযোগি স্থান আর অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিই জোসুয়া বেলকে সবার নজরে উপেক্ষিত থাকতে হয়েছিল। তিনি সেদিন ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষকের গবেষণার জন্য মেট্রো স্টেশানে ভিখারির মত ভিক্ষা করছিলেন!
পত্রিকার পাতায় পাতায় যখন খবরটি ছাপা হলো তখন কতজনেই না আফসোস করলো।যাকে টাকা দিয়েও কাছে পাওয়া যায়না সেই জোসুয়া বেল নিজে এসে ভিক্ষুকের বেসে  দুয়ারে দাড়িয়েছে অথচ তাকে কেউ চেনেনি।আমার বন্ধু ডকোটা গয়ো নিজেও আফসোস করেছিল পরের প্রায় তিন মাস ধরে।সেও নাকি সেদিন পাশ কাটিয়ে চলে এসেছিল!

এভাবেই হয়তো আমাদের প্রত্যেকের জীবন থেকেই কত গুরুত্বপুর্ন সময় হারিয়ে যায়,কত গুরুত্বপুর্ন মানুষ হারিয়ে যায় আমরা খোঁজও পাইনা।তাই জীবনের সব থেকে গুরুত্ব পুর্ন সময় হচ্ছে এখন এই সময়টা। সব চেয়ে গুরুত্বপুর্ন মানুষ হচ্ছে এই মুহুর্তে সামনে যে আছে তিনি। এবং সব থেকে গুরুত্বপুর্ন কাজ হচ্ছে যে কাজটি শুরু করেছি সেটা।

না পাওয়ার পিছনেই আমরা অবিরাম ছুটে চলেছি।মরিচিকা জেনেও সেটাকে অনুসরণ করছি। অথচ যা আমার পায়ে এসে গড়াগড়ি খাচ্ছে সেটাকে গুরুত্বই দিচ্ছিনা।

বাংলাদেশে হাতে গুনে হলেও অন্তত দশজন বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ আছেন তাদের পাশ কাটিয়ে আমরা তাই অন্য কাউকে বড় কোন পদে বসিয়ে দিচ্ছি আবার যখন জল ঘোলা হচ্ছে তাকে সরিয়ে দিতেও দ্বিধা করছিনা।

জানালা খুললে যে সুযকে উদিত এবং অস্ত যেতে দেখি সেটার দিকে আমরা ফিরেও তাকাইনা অথচ ঠিকই সেই একই সুযকে উদয় অস্ত দেখতে হাজার থেকে শুরু করে কয়েক লাখ টাকা  খরচ করে কুয়াকাটা থেকে  পাতায়া বীচে যেতেও আমাদের সময় লাগেনা।দূরের সৌন্দর্য আমাদের মোহাচ্ছন্ন করে রাখে কাছের সৌন্দযকে নেহায়েত ধুসর মনে হয়।যে পান্ডুলিপিকে জীবনানন্দ “ধূসর পান্ডুলিপি” আখ্যা দিয়েছিলেন সেটি যে আসলে ধুসর নয় বরং হীরের মত উজ্জল ঠিক তারই মত আমরাও অহেতুক মোড়ক লাগানো সৌন্দর্যের পিছনে ছুটতে ছুটতে প্রকৃত সৌন্দযকে দেখার সুযোগ পাচ্ছিনা।চোখের আড়ালেই থেকে যাচ্ছে প্রিয় কোন স্থান,প্রিয় কোন মানুষ,প্রিয় কোন স্মৃতি।

………………
এস এম হল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৫ মার্চ ২০১৬