ভাইয়ের জন্য ভালবাসা





জ্ঞান ফেরার পর তন্ময় প্রথম যে মুখটি দেখেছিল সেটি ছিল অন্তরাদির মুখ।সাত দিন পর ওর জ্ঞান ফিরেছে।শরীরে শক্তি নেই বললেই চলে।অনেক চেষ্টা করে সে তার ডান হাতটা অন্তরাদির মুখের কাছে নিয়ে তাকে ছুয়ে দেখলো।শক্তির অভাবে হাতটা আপনা আপনি নেমে এলো নিচেয়।সে অস্ফুট স্বরে জানতে চাইলো, তুমি কে?তুমি কি মাদার তেরেসা? অন্তরাদি ফিক করে হেসে দিয়ে বললো,মাদার তেরেসা হেইডা আবার ক্যাডা?আমি অন্তরা। আমারে তুমি অন্তরা দিদি কইয়া ডাকতি পারো।

তন্ময় আর কথা বাড়াতে পারেনি। ক্লান্ত হয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়েছে। সাত বছরের তন্ময়ের উপর দিয়ে যে ধকল গিয়েছে তা তার ছোট্ট শরীর সহ্য করতে পারেনি।সৃষ্টিকর্তার কৃপায় সে বেঁচে আছে কোন মত।দীর্ঘ ক্লান্তিকর ঘুমের পর সে জেগে উঠে শুধু মাত্র একটি কথাই জিজ্ঞেস করেছে, আমার অন্তরাদি কোথায়?নার্স ওর কথাতেই বুঝতে পেরেছে সে অন্তরাকে খুঁজছে।কিন্তু নার্সতো জানেনা ওর দিদি কোথায় আছে।তন্ময় ঘুমিয়ে যাওয়ার পরই অন্তরা বেরিয়ে গেছে।অন্তরার বয়স তের।থাকে টিকাটুলি বস্তিতে।

সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের চাইল্ড স্পেশালিস্ট ডা.জোবায়ের হাসান পত্রিকার পাতা উল্টাচ্ছেন।মনে মনে বিরক্তও হচ্ছেন। পড়ার মত তেমন কোন সংবাদই তার চোখে পড়ছেনা।এ পাতা ওপাতা করতে করতে হঠাৎ একটা বিজ্ঞাপন তার চোখে পড়লো।সাত আট বছর বয়সী একটা ছেলের ছবি নিচেয় লেখা সন্ধান চাই।বিস্তারিত পড়ে জানতে পারলেন ছেলেটি স্কুল থেকে আর বাসায় ফিরে আসেনি। ড্রাইভার ওকে স্কুলে আনতে গিয়ে জানতে পারে স্কুল থেকে ও আগেই বেরিয়ে গেছে।তার পর কত খোঁজাখুজি করেছে কিন্তু কোথাও পায়নি ওকে।বিগত সাত দিন ধরেই পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। ডাক্তার জোবায়ের হাসানের কেন যেন মনে হচ্ছে এই ছবির ছেলেটিকে তিনি দেখেছেন কোথাও কিন্তু ঠিক মনে করতে পারছেন না।তিনি যখন এসব ভাবছেন তখন নার্স এসে জানালো ২৭ নাম্বার ওয়ার্ডের বাচ্চা ছেলেটির ঘুম ভেঙেছে আর সে খুব কান্নাকাটি করছে।

পত্রিকা রেখে দ্রুত উঠে গেলেন ডাক্তার জোবায়ের হাসান।বিছানার ওপর যে ছেলেটি শুয়ে আছে তাকে দেখে তিনি চমকে উঠলেন।পত্রিকায় ওর ছবিইতো দিয়েছে।অথচ সাত দিন ধরে ও তারই তত্ত্বাবধায়নে চিকিৎসা নিচ্ছে।ছেলেটি তার ক্লান্ত কন্ঠে বার বার একজনের নাম ধরেই ডাকছে।আমার অন্তরাদি কোথায়? তাকে আমার কাছে নিয়ে আসো।ডাক্তারের মনে পড়ে গেল সাত দিন আগে তের চৌদ্দ বছর বয়সী একটা মেয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় এই ছেলেটিকে নিয়ে এসেছিল।মেয়েটির খালি পা, শরীরে ময়লা কাপড়,রুক্ষ এলোমেলো চুল।সেই ছোট্ট মেয়েটিই তার কোমরে গুজে রাখা চারশো টাকা ডাক্তারের হাতে ধরিয়ে দিয়ে করুণ সুরে বলেছিল “আমার ভাইডারে বাঁচান ডাক্তার সাব। আমি আরো ট্যাকা লইয়া আমু”।ডাক্তার শুধু একটি কথাই জানতে চেয়েছিলেন তোমার নাম কি?ওপাশ থেকে জবাব এসেছিল অন্তরা।

ডাক্তার মনে মনে ভেবেছিলেন সত্যিই অন্তর দিয়ে ভালবাসতে পারে যে তার নামইতো অন্তরা হওয়া উচিত। এর পর সাত দিন কেটে গেছে।তন্ময়ের এক্সিডেন্টের ঘটনাও জানা হয়েছে।স্কুল থেকে বন্ধুদের সাথে বেরিয়ে একটু দুরেই চলে গিয়েছিল।হঠাৎ একটা গাড়ি দ্রুত বেগে এসে ওকে প্রচন্ড জোরে ধাক্কা দেয়। ও ছিটকে দূরে গিয়ে পড়ে। আসেপাশে কোন লোক ছিলনা।বাস দ্রুতবেগে পালিয়ে যায়। অন্তরা নামের ছোট্ট মেয়েটি তখন ওদিকেই কাগজ কুড়াচ্ছিল।সব ফেলে দিয়ে সে ওকে সলিমু্ল্লাহ মেডিকেলে নিয়ে গিয়েছিল।

ডাক্তার অবাক হয়ে ভেবে দেখলেন ময়লা কাপড়ের ছোট্ট মেয়েটি কিভাবে কিভাবে যেন সত্যি সত্যিই অসুস্থ্য ছেলেটির চিকিৎসার টাকা জোগাড় করেছে।একবারও মনে হয়নি ছেলেটি তার কিছুই হয়না।এই সাতটা দিন ছোট্ট মেয়েটিই তন্ময়ের সেবা করেছে।তন্ময় তখন অনিশ্চিত ভবিষ্যত নিয়ে বেঁচে ছিল।রাতে ওর বিছানার পাশে মেঝেতে বসে কাটিয়ে দিয়েছে ছোট্ট মেয়েটি।ডাক্তার তার জীবনে এমন ভালবাসা কোন দিন দেখেনি।

তন্ময় তখনো সমানে কেঁদে চলেছে।অন্তরাদিকে ডাকো, আমার অন্তরাদি কোথায়?ডাক্তার কোথায় পাবে অন্তরাকে?হঠাৎ মনে পড়লো পত্রিকার বিজ্ঞাপনের নিচেয় ঠিকানা আর মোবাইল ফোন নাম্বার দেওয়া আছে।তিনি সাথে সাথে ফোন করলেন।ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ করতেই ডাক্তার জানতে চাইলেন আপনি কি তন্ময় নামে কাউকে চেনেন?আমি সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তার জোবায়ের হাসান বলছি।তন্ময় আমাদের এখানে ভর্তি আছে।

যিনি ফোন ধরেছিলেন তিনি হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন এবং ফোনটা রেখে দিলেন। ডাক্তার জোবায়ের হাসান জানেন এটা ফিরে পাবার কান্না।এর মাত্র বিশ মিনিটের মধ্যেই একটা কালো পাজেরো এসে থামলো সলিমুল্লাহ মেডিকেলের সামনে।গড়ি থেকে দ্রুত নেমে করিডোর ধরে ডাক্তারের রুমে হাজির হলেন মিষ্টার কৌশিক এবং তার স্ত্রী।মিষ্টার কৌশিক দেশের ধনাঢ্য একজন ব্যক্তি।ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ তার চোখে মুখে।হাসপাতালের বেডে থাকার পরও তিনি যে তার সন্তানকে ফিরে পেয়েছেন এটাই তার বড় পাওয়া। যদিও তিনি জানেন না কোন অবস্থায় তিনি তার একমাত্র ছেলেকে দেখতে চলেছেন। ডাক্তার তাদের দুজনকে শান্ত হয়ে বসতে বললেন।গ্লাসে পানি ঢেলে দিয়ে তাদের আশ্বস্থ করলেন যে তন্ময় ভাল আছে।কিছুক্ষণ পর তিনি দুজনকেই তন্ময়ের কাছে নিয়ে গেলেন।তন্ময় বেশ সুস্থ্য বোধ করছে। সে বিছানায় বসে ডিম পোচ আর রুটি খাচ্ছে।শরীর দুবর্ল হলেও সে আগের থেকে অনেক সুস্থ্য।মা বাবাকে দেখে সে তাদের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো।

এক ঘন্টা বাদে তন্ময়কে নিয়ে তার বাবা মা বেরিয়ে গেলেন বাসার উদ্দেশ্যে।যাওয়ার সময় ধন্যবাদ দিলেন ডাক্তারদের।ছেলেকে ফিরে পেয়ে তারা এতোটাই হারিয়ে গিয়েছিলেন যে ছেলে কিভাবে এখানে আসলো কি হলো না হলো তা নিয়ে কথা বলতেই ভুলে গিয়েছিলেন।বিল পরিশোধ করতে গিয়ে মিস্টার কৌশিক চমকে উঠলেন।তন্ময়ের দিদিই নাকি সব বিল পরিশোধ করে দিয়েছে।সামান্য বিল! সাড়ে তেরশো টাকা মাত্র।তার পরও চমকে উঠলেন তন্ময়ের বাবা মা। তন্ময়ইতো তাদের একমাত্র সন্তান। তাহলে দিদি আসলো কোথা থেকে।ডাক্তার যতটা জানে তা বললেন।তন্ময়ও তার অসুস্থ্য শরীর নিয়ে যতটা জানা ছিল বললো।সব শেষে বললো আমার দিদিকে না নিয়ে আমি বাসায় যাব না।ছেলের কথা মত ঘন্টা খানেক অপেক্ষা করলেন মেয়েটির আসার অপেক্ষা নিয়ে। কিন্তু অন্তরা আর আসলো না।

সন্ধ্যার কিছুক্ষণ আগে ডাক্তার জোবায়ের যখন বাসার উদ্দেশ্যে নিজের গাড়িতে উঠছেন তখন দেখা গেল হাসপাতালের গেট দিয়ে অন্তরা আসছে। তিনি গাড়ি থেকে নেমে দাড়িয়ে গেলেন।অন্তরার মুখে টানা হাসি।হাতে একটা পলিথিনের ব্যাগে কিছু আপেল আর একটা বেদানা।শরীরে সেই ময়লাওয়ালা জামা এবং পা খালি।ডাক্তারকে দেখে সে বললো “আমার ভাইডার জন্যি নিয়া আইলাম।আমার ভাইডা এইডা খালি তাড়াতাড়ি ভালা অইয়া যাবো”।

ডাক্তারের চোখ দিয়ে পানি চলে আসলো।সে অন্তরাকে কাছে টেনে নিয়ে বুকে জড়িয়ে নিলেন।ময়লা শরীরের অন্তরাকে আর সাধারণ কোন মানুষ মনে হলো না। তিনি ওর কপালে যখন চুমু খেলেন তখন তার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়লো।অন্তরা সারা জীবনে এমন অবাক হয়নি কখনো।বস্তিতে থাকে। বাবা মা আত্মীয় কেউ নেই।বস্তির এক পিসি তাকে দয়া করে থাকতে দিয়েছে।রোজ পথে পথে কাগজ কুড়িয়ে যা পায় তা সেই পিসিকে দেয়।কিছু কিছু সে জমিয়েও রাখে।কোন দিন কেউ তাকে বুকে জড়িয়ে নিয়েছে বলে মনে পড়েনা।

সে ডাক্তারের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার পর খেয়াল করে ডাক্তার কাঁদছেন। অন্তরা অবাক হয়।ডাক্তার চোখ মুছে ধরা গলায় বলেন অন্তরা তোমার ভাই সুস্থ্য হয়ে তার বাবা মার সাথে বাসায় চলে গেছে।এরকম কঠিন একটা সংবাদ দিতে ডাক্তারের বুক কেঁপে ওঠে।কিন্তু অন্তরা কিংবা তন্ময়ের অন্তরাদির কোন ভাবান্তর হয়না। সে খুশি মনে বলে “আমার ভাইডা ভালা অইয়া গেছে! হেইডা আগে কইবেন না?।পরে ফলের প্যাকেটটা ডাক্তারের হাতে দিয়ে বলে, “এইডা আপনে লইয়া জান। আমার ভাইডার জন্যি আনছিলাম হেইতো নেই তাইলে এইডা খাবো কেডা?আমিতো এগুলান খাইনা। হজম অয়না”।তার পর অন্তরা বেরিয়ে যায়।ডাক্তার অনেকক্ষণ তার চলে যাবার দিকে তাকিয়ে থাকে।

বাসায় ফিরে ডাক্তার জোবায়ের হাসান দেখলেন তার এক মাত্র মেয়ে ঈশিতার গলায় বেশ সুন্দর একটা চেন।সে সেটা বাবাকে দেখিয়ে বললো জানো বাবা এটা আম্মু আমাকে কিনে দিয়েছে।রান্না ঘর থেকে স্ত্রীর কন্ঠ ভেসে আসলো।তিনি বললেন, একটা ছোট্ট মেয়ের কাছ থেকে এই চেনটা এক হাজার টাকা দিয়ে কিনেছি।রুপার চেন, তবে মডেলটা সুন্দর। তাছাড়া মেয়েটা হয়তো চুরিটুরি করছে।আমাকে বলেছে তার নাকি বাবা মা আত্মীয় স্বজন কেউ নেই। তার একমাত্র ভাই তন্ময় না কি যেন নাম, খুব অসুস্থ্য তাই তার চিকিৎসার জন্য সে তার মায়ের একমাত্র স্মৃতি এই চেনটা বিক্রি করতে চায়।আমি ওর কোন কথাই বিশ্বাস করিনি।তবে চেনটা পছন্দ হওয়ায় একহাজার টাকা দিয়ে বিদায় করেছি। সোফাতে বসতে বসতে ডাক্তার জোবায়ের হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন।তার স্ত্রী কন্যা জানতেও পারলেন না ডাক্তার কেন কাঁদছেন।

বাসায় ফিরে গিয়ে তন্ময় ক্লান্ত শরীরে রং তুলি নিয়ে বসে গেল।বাবা মা নিষেধ করার পরও সে ছবি আঁকতে শুরু করলো।যে ছবিটা আঁকলো সেটা একটা ছোট্ট মেয়ের ছবি।খালি পা,শরীরে ছেড়া একটা জামা।অপটু হাতে আঁকা ছবিতেও তন্ময় তার একমাত্র দিদিকে ভালই একেছে। সে অবাক হয়ে দেখছে তার অন্তরাদি তার দিকে তাকিয়ে হাসছে আর বলছে ”মাদার তেরেসা?হেইডা আবার ক্যাডা?আমারে তুমি অন্তরা দিদি কইয়া ডাকতি পারো”।তন্ময়ের চোখ ভিজে ওঠে।অন্তরাদি অন্তরাদি বলে হু হু করে কেঁদে ওঠে।আম্মু ছুটে এসে ছোট্ট তন্ময়কে বুকে জড়িয়ে নেয়। কিন্তু অন্তরাদি ছাড়া যেন ওর কান্না কোন দিনই থামবেনা।

১৩ মে ২০১৬

পিকুলিয়ার


--জাজাফী

এ বিশ্ব চরাচরে কতো আজিব মানুষ দেখতে পাই। সেরকমই একজন আজিব মানুষ এই মুহুর্তে আমার সামনে বসে আছে। আজিব বলছি এ জন্য যে তার পকেট থেকে দুটো পাঁচশ টাকার নোট পড়ে গেল। আমি বললাম আপনার পকেট থেকে দুটো পাঁচশ টাকার নোট পড়ে গেছে তুলে নিন নয়তো অন্য কেউ নিয়ে নেবে। তার মনের মধ্যে কোন ভাবান্তর হলো বলে মনে হল না। সে বললো যে টাকা পড়ে যায় তা তুলে নিতে হয় না! শুনেতো আমার পোয়াবারো। আমি বেশ অভাবেই ছিলাম। কোন কথা না বলে টাকাটা তুলে নিলাম। তারপরও লোকটা কিছু বললো না। যেহেতু তার এক হাজার টাকা আমি নিয়ে নিয়েছি তাই তাকে আতিথেয়তা করা আমার কর্তব্য। দারোয়ানকে ডেকে বললাম দু'কাপ চা নিয়ে আসেন সাথে দুটো বিস্কুট। আমার কথা মতো দারোয়ান চা আর বিস্কুট নিয়ে হাজির। 

 লোকটা হাসি মুখে চা খেয়ে গেলেন আর যাওয়ার সময় বললেন চায়ের দামটা কি আমি দিতে পারি? আমি মনে মনে তাজ্জব হয়ে গেলাম। এ কোন আজিব লোক! কোন মতো সম্মতি দিলাম আর তিনি পকেট থেকে একটা দশটাকার নোট বের করে দারোয়ানের হাতে ধরিয়ে দিল। লোকটা যদি রোজ আসতো আর তার পকেট থেকে দুটো করে নোট পড়তো তাহলে আমার আর কোন চিন্তা থাকতো না। আমি বললাম আপনি আবার আসবেন। লোকটা বললো দেখি সময় পেলে আসবো। যাওয়ার সময় বললো ওহ ভুলে গেছি আমার দুই তিনশো টাকা দরকার। আপনার কাছে খুচরা হবে? আমি বললাম ঠিক আছে পাঁচশো টাকা নেন। সে মাথা নেড়ে বললো না পাঁচশো নেয়ার দরকার নেই আমার দরকার চারশো টাকা। 

আমি পকেট থেকে চারশো টাকা তার হাতে দিলাম। সে বললো আমি কালকেই আপনার টাকাটা ফেরৎ দেব। আমি বললাম না না ফেরৎ দেয়ার দরকার কী! আর তাছাড়া আমিতো একটু আগেই আপনার এক হাজার টাকা কুড়িয়ে নিলাম। লোকটা বললো বার বার ওই টাকাটার কথা বলে আমাকে লজ্জা দিচ্ছেন কেন? আমিতো শিখেছি পড়ে যাওয়া টাকা তুলে নিতে নেই। তবে আপনার কাছ থেকে যে টাকা নিলাম এটা ফেরত দিয়ে যাব যদি বলেন। আমি আবার বললাম না দিতে হবে না। সে বললো দিতে হবে, কেন দিতে হবে না। পরে ভাববেন যে দিলেই ভালো হতো। 

আমি তার পিকিউলিয়ার চরিত্র দেখে মনে মনে হেসে নিলাম। এরকম দু'চারটা লোক কেন যে আমার সামনে রোজ আসে না। আমার অফিসে সে কোন একটা কাজে এসেছিল। তার কাজ হয়েছে কিনা জানি না তবে আমার যে কাজ হয়েছে সেটা অসাধারন। পকেটে মাত্র চারশো টাকা ছিল এখন সেখানে আছে এক হাজার টাকা। বাহ এর চেয়ে সুখের আর কি থাকতে পারে। লোকটা আবার আসুক আর আমার পকেট ভারি হোক। 

অফিস থেকে বেশ ফুরফুরে মেজাজে বের হলাম। কারণ আমার পকেটে দুটো পাচশো টাকার নোট আছে। যাবার সময় তানিয়ার জন্য বেশ ভাল দেখে কিছু কিনে নিয়ে যাব। বেশ কিছুদিন মাংস খাইনি তাই মীনা বাজার থেকে দু কেজি মাংসও কেনা যাবে। আমি মীনা বাজারে গিয়ে ভাল দেখে দু'কেজি মাংস নিলাম আর তানিয়ার জন্য একটা শ্যাম্পু। মোট দাম যা আসলো তাতে দেখা গেল আরো কিছু টাকা থেকে যায়। ভাবলাম থাক না কিছু টাকা পরে আবার কিছু কেনা যাবে। কাউন্টার মাস্টারকে পঞ্চাশ টাকা বকশিশ দেব ভাবছি। পকেট থেকে পাঁচশো টাকার নোট দুটো বের করে কাউন্টারম্যানকে দিলাম। লোকটা নোট দুটো নেড়ে চেড়ে দেখলো। এমন ভাব করছিল যেন পাঁচশো টাকার নোট সে জীবনেও দেখেনি। 

আমি মনে মনে বললাম ব্যাটা এতো ছোট মন নিয়ে এখানে এসেছ কেন? পাঁচশো টাকার নোটই দেখনি কাল যখন এক হাজার টাকার নোট দেব তখনতো তুমি ইহধাম ত্যাগ করবে। লোকটা নোট দুটো নিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখে মুখটা গোমরা করে ফেললো। নোট দুটো আমার দিকে ফিরিয়ে দিয়ে বললো এই নোট দুটো জাল। আমারতো মাথা খারাপ। এ লোক বলেকি। আমি কি আন্ধা নাকি যে জাল আর আসল চিনবো না। 

আমি নোট দুটো তার হাত থেকে নিয়ে ভালো মতো নেড়ে চেড়ে দেখলাম। আমার মাথায় হাত। ব্যাটা বাটপার আমার অফিসে এসে আমার পকেটের শেষ চারশো টাকা নিয়ে গেছে আর এই জাল পাঁচশো টাকার নোট দুটো রেখে গেছে। আর বলে কিনা পড়ে যাওয়া টাকা তুলে নিতে নেই। শেষে আর কি করি মীনা বাজার থেকে বউয়ের জন্য মাংস বা শ্যাম্পু কোনটাই না নিয়ে অপমানিত হয়ে ফিরে আসলাম। রাস্তায় একা একা হাটছি আর ঘেমে যাচ্ছি। যে চারশো টাকা ছিল তা দিয়ে আগামী এক সপ্তাহ চলার কথা ছিল। এখন যদি বউকে গিয়ে বলি কিছু টাকা দাও, বউতো আমাকে ঝেটিয়ে বিদায় করবে।

১১/১২/২০১৩

বার্কেনাভের কথা বলা ওয়াগন



                        
#জাজাফী

মিস্টার অ্যালেক্স ২৬ বছর ধরে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষগুলোকে জায়গাটা ঘুরিয়ে দেখাচ্ছেন।দীর্ঘ জীবন নানা পেশার নানা জাতির মানুষের সাথে মিশে তার অভিজ্ঞতার ঝুলিটিও পরিপুর্ন।পর্যটকেরা তার মত গাইড পেলে তাদের ভ্রমনে যোগ হয় অনেক বৈচিত্র।তিনি খুটিয়ে খুটিয়ে স্থানগুলো শৈল্পিক বর্ণনা দিয়ে থাকেন।ফাহিম যখন প্রথম বার্কেনাভে গেল তখন ওর গাইড ছিলেন মিস্টার অ্যালেক্স।ঘুরতে ঘুরতে তিনি নানা তথ্য জানাচ্ছিলেন। তিনি তার আঙুল উচিয়ে দুরে বাউন্ডারি সীমানার বাইরে দাড়িয়ে থাকা নগ্নপ্রায় এক পাগলের দিকে ইঙ্গিত করলেন।বিগত ২৬ বছর ধরে তিনি ওই পাগলকে দেখছেন।মিস্টার অ্যালেক্সের আর সব বর্ননা শুনতে সবার ভাল লাগলেও পাগলের কথা শোনার পক্ষে কেউ ছিলনা।তাই তিনি পাগল সম্পর্কে বলতে গিয়েও কিছুই বলতে পারলেন না। তিনি ২৬ বছরের ট্যুর গাইড  জীবনে একজনকেও পান নি যে ওই পাগলের কথা শুনতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

তিনি এবারও কোন কথা না বাড়িয়ে বাকি স্থাপনা গুলো দেখাতে শুরু করলেন।পর্যটকরা যখন ঘোরা শেষ করলো তখন তার কিছুটা বিশ্রাম। পরবর্তী দল না আসা পযর্ন্ত তার আর কোন কাজ নেই।বাইরে প্রচন্ড ঠান্ডা। তিনি চেয়ার টেনে বসলেন, সামনের টেবিলে ধোয়া ওঠা কফির মগ।তিনি যখন আপন মনে কফিতে চুমুক দিচ্ছেন তখন তার পাশে এসে দাড়াল তের বছরের ফাহিম। ফাহিম ওর বাবা মা আর ভাইয়ার সাথে ঘুরতে এসেছে।বাবা মা ফিরে যেতে চাইলে ফাহিম জোর করে কিছুটা সময় নিয়েছে তাদের কাছ থেকে। তার পর সোজা চলে এসেছে মিষ্টার অ্যালেক্সের কাছে।

হঠাৎ করে ফাহিমকে দেখে মিষ্টার অ্যালেক্স চমকে উঠলো।অনেক মানুষের সাথে ওঠা বসা করলেও তার স্মৃতি শক্তি প্রখর। এই ছোট্ট ছেলেটিকে যে তিনি কিছুক্ষণ আগে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পুরো এরিয়াটা দেখিয়েছেন তা আবছা হলেও তার মনে আছে। তিনি কিছুটা ভয় পেয়ে গেলেন। তবে কি ছেলেটি তার পরিবারকে হারিয়ে ফেলেছে? এখনতো তাহলে এই ছেলেটিকে নিয়ে ঝামেলা হবে বেশ। পরবর্তী পযর্টক দলকে ঘুরিয়ে দেখানোর পরিবর্তে এই ছেলেকে তার পরিবারের কাছে পৌছে দিতেই সময় পার হয়ে যাবে।

মিস্টার অ্যালেক্স পরিস্থিতি সামাল দিয়ে মুখে একটু হাসি এনে জানতে চাইলেন ফাহিম কি তার পরিবারকে হারিয়ে ফেলেছে? ফাহিম উত্তর দিল যে সে তার পরিবারকে হারিয়ে ফেলেনি। তারা বরং তার জন্য বাইরেই অপেক্ষা করছে।মিস্টার অ্যালেক্স কৌতুহলী হয়ে উঠলেন?যিনি মানুষকে ইতিহাসের বেলাভূমি দেখাচ্ছেন বিগত ছাব্বিশ বছর ধরে তার মধ্যে কৌতুহল থাকাই স্বাভাবিক। অজানাকে জানার আগ্রহ তাকে পেয়ে বসেছিল বলেই হয়তো সে ট্যুর গাইড হয়েছিল।
  মিস্টার অ্যালেক্স এবার ওকে বসতে বললেন।ওকে কফি অফার করলেন।টেবিলে ফ্লাক্স ভর্তি কফি, পাশে এক্সট্রা কাপও ছিল।ছোট্ট ফাহিম কফির আমন্ত্রন গ্রহণ করলো।কাপে কফি ঢালতে ঢালতে মিস্টার অ্যালেক্স ফাহিমের আগমনের কারণ জানতে চাইলে খুব সাবলিল ভাবে ফাহিম বলতে শুরু করলো। কথা বলাতে দুজনের কারো কোন সমস্যা হলনা কারণ মিষ্টার অ্যালেক্স ইংরেজী ভাষাভাষি পাশাপাশি ফাহিমও ব্রিটিশ কারিকুলামে পড়ার কারণে ইংরেজীতে তুখোড়।
তের বছরের একটা ছেলের আগ্রহের বিষয় দেখে মিস্টার অ্যালেক্স চমকে উঠলেন। ‘সিন্ডলার্স লিস্ট’র বধ্যভূমি সম্পর্কে সে জানতে চায়নি। এমনকি জানতে চায়নি তাদের সেই বিখ্যাত দালান,রাজবাড়ি বা নগরকেন্দ্রের গল্প। যেগুলো সে সময় গুড়িয়ে দিয়েছিল হিটলারের বাহিনী। আবার কেমন করে,নতুন করে বানানো হলো তার ইতিহাসও জানতে চায়নি।ছোট্ট ছেলেটি জানতে চায় মিষ্টার অ্যালেক্সের দেখানো দূরে দাড়িয়ে থাকা নগ্নপ্রায় পাগল মানুষটির কথা!

ছাব্বিশ বছরের ট্যুর গাইড  জীবনে কত কিছু দেখেছেন মিস্টার অ্যালেক্স। কত আজব মানুষের সাথে তার সাক্ষাৎ হয়েছে। কত জন কত ধরনের প্রশ্ন করেছে কিন্তু ছোট্ট এই ছেলেটির সাথে অন্য সবাই যোজন যোজন ব্যবধানে। এখন তার কাছে মনে হচ্ছে পরবর্তী কয়েক বছরও যদি সে নতুন পর্যটকদের না ঘুরিয়ে ছেলেটির সামনে বসে থাকতে হয় তো থাকবে। ছেলেটি যে নগ্নপ্রায় মানুষটির কথা জানতে চেয়েছে তাকে নিয়ে সমান আগ্রহ তার নিজেরও।সেই শুরুতেই লোকটিকে দেখেছেন। তখন লোকটি ছিল যুবক বয়সী।টুকটাক কিছু কথাও জেনেছেন কিন্তু এতো বছরেও কোন দিন লোকটার সাথে কথা বলা হয়নি।একজন নামকরা ট্যুর গাইড কেন একটা পাগলের সাথে কথা বলবে।পাগল লোকটার নাম বার্কেনাভ!

নামটা শুনেই ফাহিম নড়ে চড়ে বসে। কথার মাঝখানে থামিয়ে দিয়ে জানতে চায় তবেকি ওই লোকটার নামেই এই স্থানটাকে বার্কেনাভ বলা হয়? মিস্টার অ্যালেক্স হাসেন।প্রথম দিকে তিনিও তাই মনে করেছিলেন। কিন্তু আসলে তা নয়।কাকতালীয় ভাবে এই জায়গাটার নামের সাথে লোকটির নাম মিলে গেছে। তবে অধিকাংশই এখন আর ওসব মনে রাখেনা। নতুন আসা পর্যটকেরা যদি কেউ জানতে পারে যে পাগলটার নাম বার্কেনাভ তবে ধরেই নেয় তার নামেই স্থানটার নামকরণ করা হয়েছে। সে তো আহামরি কেউ ছিলনা যে তার নামে একটা যায়গার নামকরণ করা হবে।

ফাহিমের হঠাৎ মনে পড়ে একটা ওয়াগন দেখিয়ে মিস্টার অ্যালেক্স বলেছিলেন এই সেই বিখ্যাত বার্কেনাভের ওয়াগন। মিষ্টার অ্যালেক্সকে সে প্রশ্ন করে এটা নিয়ে। মিষ্টার অ্যালেক্স চমকে ওঠে।ছোট্ট এই ছেলেটি এতো কিছু খুটিয়ে খুটিয়ে লক্ষ্য করেছে?এতো কিছু মনে রেখেছে।তার ভাল লাগা আরো বেড়ে যায়।তিনি বলতে শুরু করেন বার্কেনাভের ওয়াগন সম্পর্কে।লোক মুখে শুনেছে বার্কেনাভ নামক ওই পাগলটা সবাইকে বলে বেড়ায় ওটা তার ওয়াগন।এভাবেই আস্তে আস্তে ওই ওয়াগনের নাম হয়ে ওঠে বার্কেনাভের ওয়াগন।ওই ওয়াগনে করে হাজার হাজার নীরিহ নারী পুরুষ ও শিশুকে ধরে ধরে গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে মেরে ফেলা হয়েছিল। ফাহিমের আগ্রহ দেখে মিষ্টার অ্যালেক্সের নিজের মনের মধ্যে জমে থাকা সুপ্ত আগ্রহটাও জেগে ওঠে। তিনি চট করে ফাহিমকে বলেন তবে কি তুমিও চাও ওই পাগল বার্কেনাভের সাথে দেখা করে কথা বলতে।

ছোট্ট ফাহিম আশ্চর্য হয়ে ভাবে দুর বিদেশের এই মধ্য বয়সী মানুষটি কত সহজেই না তার মনের ভাষা বুঝে ফেলেছে।সে তো সত্যিই ওই লোকটার সাথে দেখা করতে চায়। কিন্তু ফাহিম জানেনা ঠিক তারই মত মিষ্টার অ্যালেক্সও দীর্ঘদিন ওই লোকটার সাথে কথা বলার এবং ওই লোকটাকে নিয়ে ভাবার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ফাহিমের মত কেউ তাকে আগ্রহ দেখায়নি বলে নিজে কিছু করতে পারেনি।
ফাহিম আর মিষ্টার অ্যালেক্স বেরিয়ে আসলো।হ্যা দুর থেকেই দেখা যায় পাগল প্রায় লোকটি কংক্রিটের ওপর স্তুপ হয়ে জমে থাকা বরফের আস্তরনে ঢাকা জায়গাটিতে কি যেন করছে।বাইরে ফাহিমের ভাইয়া আর বাবা মা ওর জন্য অপেক্ষা করছিল।ও বেরিয়ে আসতেই মা বললো এতো দেরি হলো কেন? চলো হোটেলে ফিরে যাই।ফাহিম জানালো ওর আরো কিছু সময় চাই। মিস্টার অ্যালেক্সও জানালো হ্যা আমাদের আরো কিছু সময় চাই।

ভাইয়া বাবা মা তিনজনই অবাক হয়ে দেখলো অজানা অচেনা এই দেশে ইংরেজ এক ট্যুর গাইডের সাথে ফাহিমের কী মধুর বন্ধুত্বইনা হয়ে গেছে।তারা জানতে চাইলো কি জন্য সময় লাগবে তখন ফাহিম হেসে দিয়ে বললো ঐ যে দূরে দাড়িয়ে আছে যে পাগলটা, আমরা দুজন তার সাথে কথা বলবো। এটা শুনে ভাইয়া হেসে দিল। বললো মানুষ দূর বিদেশে আসে তার সৌন্দর্য তার ইতিহাস জানার জন্য আর আমাদের ফাহিম এসেছে পাগলের সাথে দেখা করতে, কথা বলতে।

আম্মু বললেন বসুনিয়া পট্টিতে যে নুরা পাগলা আছে তার সাথেতো কোন দিন কথা বলিস নি আর এখানে এসে এক পাগলে সাথে কথা বলবি। ফাহিম হেসে দিল, সেই সাথে মিষ্টার অ্যালেক্সও। বাবা মার সাথে কি কথা হয়েছে, মিষ্টার অ্যালেক্স সেটা বুঝতে না পারলেও অনুমান করে নিয়েছেন যে তারা পাগলে সাথে কথা বলবে বিষয়টা ফাহিমের বাবা মা ভাইয়া হাসি ঠাট্টার পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
ফাহিম আর মিষ্টার অ্যালেক্সকে আর কষ্ট করে বলতে হলো না যে তোমরা এখানে থাকো আমরা ঘুরে আসি।এমনিতেই তারা কেউ ওদের সাথে পাগলের কাছে যেতে আগ্রহ দেখাল না। এতে করে দুজনেরই সুবিধা হলো। নিজেদের মত করে কথা বলা যাবে।

সবাই যাকে পাগল বার্কেনাভ বলে চেনে সে তখন আপন মনে বিড়বিড় করছে।যেতে যেতে ফাহিম মিস্টার অ্যালেক্সকে প্রশ্ন করেছে বার্কেনাভ কোন ভাষায় কথা বলে?কিংবা সে কি আদৌ কথা বলতে পারে?মিষ্টার অ্যালেক্সের এ বিষয়ে কোন ধারণা নেই। তিনি অবাক হয়ে ভাবছেন বিগত ছাব্বিশ বছর দেখার পরও তার সাথে একবারও কথা বলা হয়ে ওঠেনি!অবশ্য পাগলের সাথে কথা বলাই লাগবে এমনতো কোন নিয়ম করা নেই।তিনি ফাহিমকে জানালেন নাম শুনে মনে হয় জার্মানি বা পোল্যান্ডের লোক।তাহলে ভাষাও নিশ্চই তাই হবে। আবার এমনও হতে পারে সে অন্য কোন দেশের।কিংবা এমনও হতে পারে এখন আর সে ঠিকমত ভাষাই ব্যবহার করতে ভুলে গেছে।

ওরা যখন বার্কেনাভের সামনে গিয়ে দাড়াল সে তখন বরফের ওপর আকিবুকি করছে।ফাহিম আশ্চর্য হয়ে দেখলো বরফের এই দেশে সে যেখানে ওভারকোটের নিচেয় আরো কয়েকপ্রস্থ কাপড় পরার পরও শীতে জমে যাচ্ছে সেখানে বার্কেনাভের পরনের ছেড়া প্যান্ট টুকু ছাড়া সারা শরীরে আর কোন কাপড় নেই।তার হাত বা শরীর শীতে কাপছেনা।সে যেন মানুষের দেহের আড়ালে পেঙ্গুইন বা মেরু ভল্লুক হয়ে গেছে।
ওদেরকে দেখে মাথা তুলে তাকাল বার্কেনাভ।

ফাহিম আর মিষ্টার অ্যালেক্স ওর সামনে বসলো।যে মানুষটিকে সবাই অবহেলা করে আজ তারই সামনে বসে আছে দুজন স্বাভাবিক মানুষ। মিষ্টার অ্যালেক্স কিছু বলার আগেই ফাহিম তার নাম ধরে ডাকলো।বার্কেনাভ ওর দিকে তাকাল।তার মানে এই নয় যে সে ইংরেজী ভাষা বুঝেছে বা বুঝবে। নামতো যে যে ভাষারই হোক উচ্চারণ প্রায় কাছাকাছিই হয়। ও আরো কিছু বললো কিন্তু বার্কেনাভ বুঝলো কিনা তা সে জানলো না।এবার মিষ্টার অ্যালেক্স জার্মান ভাষায় কথা বললো। হ্যা লোকটা বেশ সচকিত হয়ে উঠলো। পাগল হলেও তার ব্রেনের কিছু অংশ এখনো ভাল আছে বলেই মনে হলো।ওদের সাথে কথা বলতে বলতে বার্কেনাভকে দেখা গেল উত্তেজনা বোধ করছে।

ফাহিম আইপ্যাড বের করে একটা ছবি মেলে ধরলো বার্কেনাভের দিকে।তার চোখটা তখন বড় বড় হয়ে গেল।ছবিটা ছিল সেই ওয়াগনের।যে ওয়াগনকে সবাই বার্কেনাভের ওয়াগন বলে চেনে।ছবিটা দেখার পর বার্কেনাভ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লো।সম্ভবত এই প্রথম বার্কেনাভের চোখে পানি আসলো।সম্ভবত ওই প্রথম বার্কেনাভ কথা বললো।জার্মান ভাষায় ভাঙ্গা ভাঙ্গা ভাবে কথা বললো বার্কেনাভ।মিস্টার অ্যালেক্স আশ্চর্য হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।এই লোকটিকে সবাই পাগল বলে জানে এবং ধারে কাছেও কেউ ঘেসেনা।লোক মুখে শোনা যায় বার্কেনাভ ওই ওয়াগনটিকে নিজের বলে দাবী করতো আর ওটার কাছাকাছি পড়ে থাকতো। সরকারের কর্তাব্যক্তিদের আদেশে পুলিশ বার্কেনাভকে ওদিকে আর ঘেষতে দেয়না। বাউন্ডারি দিয়ে রেখেছে তাই বার্কেনাভ সেদিকে যেতেও পারেনা।বার্কেনাভ যে এখনো কিছুটা হলেও স্বাভাবিক ভাবে কথা বলতে পারে এটাই হয়তো কেউ জানেনা।

হিটলার নরপিশাচের মত অত্যাচারে লিপ্ত হয়ে উঠলো্। যাকে যেখানে পেয়েছে বিশেষ করে ইহুদিদের সে নিয়ে আসছে এখানে।কারো একদিনের জীবন, কারো বা বছরের পর বছর বন্দি জীবন কেটেছে অনাহার অর্ধাহারে।বার্কেনাভ বলছে আর ফাহিম এবং মিষ্টার অ্যালেক্স মন্ত্রমুগ্ধের মত তা শুনছে। ফাহিম তার ভাষা বুঝছেনা দেখে অ্যালেক্স বার বার ভাষান্তর করে দিচ্ছে।

এক সকালে বার্কেনাভকে তার বাবা মা  ঘুম থেকে ডেকে তুললো।বাক্স পেটরা গুছিয়ে তারা চললো কোন এক অজানার উদ্দেশ্যে।বার্কেনাভের বয়স তখন ছয় কি সাত বছর।বাবা মার সাথে সে কোথায় যাচ্ছে তা তার জানা ছিলনা। ওরা চেকোশ্লোভাকিয়াতে বাস করতো।ওদের আদি নিবাস ছিল ওটা।চেকোস্লোভাকিয়া থেকে হাজার হাজার মানুষকে ট্রেনে তোলা হলো। ট্রেনের সেই বগিতে গাদাগাদি করে বার্কেনাভরা উঠে বসলো। ট্রেনটি ছুটে চলেছে ক্রাকভ শহর থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে আসভিচ (Auswitch) নামের একটা ছোট্ট গ্রামে।সময়টা ১৯৪৩ সাল।

বার্কেনাভের অতটা মনে নেই।এর পর একে একে দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেল বার্কেনাভ আর তার মা ও বাবা।বাবা আর মাকে একটা ওয়াগনে করে কোথায় যেন নিয়ে যাওয়া হলো আর ছোট্ট সাত বছরের বার্কেনাভ থেকে গেল অন্য একটা দলের সাথে।সেই দলে ওর বয়সী এবং ছোট বড় অনেক ছেলে মেয়ে ছিল।সেই সাথে ছিল বৃদ্ধ বয়সী অনেক মানুষ।একটা ঘরে নিয়ে ওদের পোষাক জুতো সব খুলে নেওয়া হলো।তার পর সেই ওয়াগনে তুলে দেওয়া হলো।

সেই ওয়াগনে ছিল শুধু মাত্র ওর বয়সী এবং ওর থেকে ছোট বড় আরো চল্লিশ জন ছেলে মেয়ে।কারো শরীরে কাপড়ের ছিটেফোটাও নেই। সবাই ভয়ে কান্নাকাটি করছে।কে উলঙ্গ তার দিকে কারো নজর নেই।ছোট্ট বার্কেনাভ তখন দিশাহারা,বাকহারা। কি হচ্ছে তা তার ধারনা নেই।ওয়াগনের সবার চিৎকার আর কান্নার শব্দে কান ফেটে যাওয়ার জোগাড়। হঠাৎ ছোট্ট বার্কেনাভ শুনতে পেল কে যেন বলছে পালিয়ে যাও,ওরা তোমাদের মেরে ফেলবে। গ্যাস চেম্বারে ঢোকানোর কিছুক্ষণ আগে ফাঁকা জায়গাতে ওদের ওয়াগনটা কিছু সময়ের জন্য থেমেছিল।তখন অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে।ওয়াগন চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল যে এসএস সৈন্য সে কয়েক মিনিটের জন্য গাড়ি থামিয়ে কোথায় যেন চলে গেল।ওয়াগনের ভিতরে বাতাস ঢোকার জন্য ছোট্ট একটা জানালা ছিল সিক বিহীন।বার্কেনাভ ছিল অত্যন্ত রোগা এবং কৃষ্ণবর্ণের। অনায়াসেই সে ওই জানালা দিয়ে বেরিয়ে গেল।অন্যরা কেউ বের হলো কিনা তা বার্কেনাভের মনে নেই।সেই অন্ধকারে মিশে গেল তার শরীরের কালো রং।তার পর উলঙ্গ অবস্থায় ছুটে কিভাবে কিভাবে যে বেরিয়ে গেল তা আর বার্কেনাভ মনে করতে পারেনা।

বার্কেনাভের ভাষায় সেই যে ছুটে বেরিয়ে আসা এবং সেই যে পালিয়ে যাওয়ার কথাটা ওই ওয়াগনই বলেছিল।তার মনে ওই ওয়াগন কথা বলতে পারতো।

পালিয়ে যাওয়ার পর কোথায় আর যাবে?ছোট্ট বার্কেনাভের কেবলই মনে হচ্ছিল পৃথিবীতে হয়তো এমন কোন জায়গাই নেই যেখানে হিটলারের নাৎসি বাহিনী নেই।এর পর কিভাবে কোথায় কেটেছে তা বার্কেনাভের মনেও পড়েনা।ফাহিম জানতে চায় এর পর কি কোন দিন ওই ওয়াগনের কাছে গিয়েছেন?কথা বলেছেন? কিংবা কিভাবে জানলেন ওই ওয়াগনটাই সেই ওয়াগন? ফাহিমের কথাগুলো ভাষান্তর করে দেয় মিস্টার অ্যালেক্স।শুনে আরো আপ্লুত হয় বার্কেনাভ।তার কথা বলা দেখে মনেই হয়নি সে পাগল।আসলেও বার্কেনাভ পাগল নয়।তার স্মৃতি তাকে পাগলের মত আচরণ করতে বাধ্য করেছে।

বাকের্নাভ জানায় সে সুস্থ্যভাবেই বেড়ে উঠেছিল। সে কিভাবে কিভাবে যেন বুলগেরিয়াতে চলে গিয়েছিল। আজ থেকে উনত্রিশ বছর আগে সে যখন এখানে এসেছিল ঠিক ফাহিমের মতই ঘুরতে। তখন ওই ওয়াগনটার সামনে যেতেই ওয়াগনটা কথা বলে উঠেছিল। বলেছিল বার্কেনাভ তুমি বেঁচে আছ? তোমার সাথে দেখা হবে তা ভাবিনি।আমি আশেপাশে তাকিয়ে দেখলাম কে কথা বলে।নাহ আশে পাশে আমার ভাষাভাষি কাউকে দেখলাম না।তখন আপন মনে বিড়বিড় করে বললাম কে কথা বলে?ওয়াগন তখন বলেছিল আমি তোমাকে পালিয়ে যেতে বলেছিলাম মনে পড়ে?আমার দিকে তাকাও,আমি তোমার সেই ওয়াগন, যেটাতে তোমাকে গ্যাস চেম্বারে ঢোকানো হচ্ছিল।“

সেদিন ওই কথাটুকু শোনার সাথে সাথে মুহুর্তেই বার্কেনাভের পুরোনো সেই স্মৃতি মনে পড়েছিল। সে অন্য সব পযর্টকদের সামনেই হাউমাউ করে কেঁদে ওই ওয়াগনটিকে জড়িয়ে ধরে কথা বলেছিল।সেদিনই সবার চোখে বার্কেনাভ পাগল বলে পরিচিত হয়ে গেল।এর পর আর কোন দিন বার্কেনাভ বুলগেরিয়াতে ফিরে যেতে পারেনি।যে ওয়াগনের জন্য বার্কেনাভ হিটলারের নির্মম হত্যাকান্ড থেকে বেঁচে গিয়েছিল সেই ওয়াগনকে রেখে বার্কেনাভ কি করে বুলগেরিয়াতে ফিরে যাবে?

আস্তে আস্তে একদিন দুদিন করতে করতে হাজার হাজার পযর্টকের কাছে বার্কেনাভ পরিচিত হয়ে উঠলো তার আর তার ওয়াগনের কথোপকথনের কারনে। সেই থেকে ওই ওয়াগনটি হয়ে উঠলো বার্কেনাভের কথা বলা ওয়াগন। বার্কেনাভের মুখের কথা ভাষান্তর হয়ে যখন ছোট্ট ফাহিমের কাছে আসছিল তখন তার চোখ বেয়ে অবিরাম অশ্রু ঝরছে।সেই সাথে মিস্টার অ্যালেক্সের চোখেও।

ওরা বার্কেনাভের বলা কোন কথাই অবিশ্বাস করেনি।গোটা দুনিয়া হয়তো অবিশ্বাস করবে কিন্তু ফাহিম আর মিস্টার অ্যালক্স তা অবিশ্বাস করবেনা।নগ্নপ্রায় পাগল বলে পরিচিত বার্কেনাভকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে ফাহিম।বার্কেনাভ বুঝে উঠতে পারেনা।একটু সময় নিয়ে সেও জড়িয়ে ধরে ওকে।এটা দেখলে কারো মনেই হতো না এই বার্কেনাভ পাগল এই বার্কেনাভ হিটলারের বানানো গ্যাস চেম্বারে ঢুকে মরতে মরতে বেঁচে এসেছে।


.........................................................................
২৮ মার্চ ২০১৬
উত্তরা,ঢাকা-১২৩০



     

একটি দিনই প্রাপ্য ছিল তার?


................................
,...........‪#‎জাজাফী‬
মাকে তুমি কতটুকু ভালবাসো বলো?
দিনে কয়বার মনে পড়ে মাকে?
মূখে বড় কথা বলো,ফেসবুকে ছবি দাও
উঠতে বসতে সেই তুমি খোটা দাও তাকে।


সবাই মাকে নিয়ে পোষ্ট দেয়,ছবি দেয়
আমার কোন ছবি নেই,থাকলেও আমি দেবনা
তাই বলে আমি মাকে ভালবাসি কম
একবারে ভালবাসিনা তা ভেবো না।

সে মা ! সে না খেয়ে তোমােক খাওয়ায়
তুমি খেয়ে যাও ভাবনা কিছু
বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও,মা চেয়ে থাকে
একবারও ফিরে চাওনা পিছু।

তোমার শহর প্রীতি,গাড়ি, বাড়ি আরো কত কি
সাথে বান্ধবী আড্ডা গান
সেখানে অশিক্ষিত মাকে টেনে আনা
তুমিই ভাবো! যেন সেটা নিজের অপমান।

কাটা চামচে খাচ্ছ তুমি, মুখে হাসি আছে
পাশে বন্ধু বান্ধবী কত জন থাকে
শুধু জাত যাবে ভেবে ভেবে
ওখানে ওদের পাশে রাখা যায়না মাকে।

তুমিই গান করো মায়ের এক ধার দুধের দাম
সেটা নাকি শোধ হবেনা গায়ের চামড়া কেটে জুতা বানিয়ে দিলে
সেই মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসো তুমি
মায়ের দূধের ঋণ শোধ করেছ এভাবে সবাই মিলে।

আমি খাই কিংবা অর্ধাহারে থাকি,সাথে থাকে মা
সাথে থাকে তার নিরেট ভালবাসা,সাথে আমিও
আমি মুখে বলি মা ভালবাসি ভালবাসি
মা ডাক আমার কাছে দামীও।

একদিন মা মা বলো,ছবি দিয়ে, কথা বলে জানাও সবারে
তুমি যেন মাকে ছাড়া অসহায় সত্যি
ভিতরে ভিতরে মায়ের জন্য ভালবাসা নেই
ভালাবাসা থাকেনাতো এক রত্তি।

আমি ঢং করি কম,ভালবাসি ভালবাসি বলে
হয়তো করিনা অত আস্ফালন
মা আমাকে যেমন ছোট বেলা থেকে ভালবেসেছে
আমি সেটা স্বযতনে করেছি পালন।

আমার প্রতিটি দিন মাকে দেই,প্রতিটি মিনিট
সেকেন্ড বা ক্ষণ সেতো মার
তবে কেন তাকে ঘটা করে দেব এই একটি দিন
বছরের একটি দিনইকি প্রাপ্য ছিল তার?
..........................................
৭ মে ২০১৬